সম্পাদকের কলমে--

সম্পাদকের কলমে--তাপসকিরণ রায়:

সম্পাদকীয়, পত্রিকার একটি অভিন্ন অঙ্গ। সাহিত্য জীবনের দর্শন। জীবনের সুখ দুঃখ সবকিছু উঠে আসে এখানে, স্মৃতির ঝাঁপি, প্রেম-বিরহ থেকে নিবেদন পর্যন্ত এখানে প্রতিফলিত হয়। এ সব দর্শন জীবনের ধারাবাহিকতাগুলিকে প্রচন্ডভাবে আলোড়িত করে। বর্তমান সময়ে যে ভয়াবহতার সৃষ্টি হয়েছে তার সবটুকুই করোনা মহামারীর দৌরাত্ম।

সবাই আজ আমরা আতঙ্কিত, বদ্ধ-বন্ধ বন্দীশালায় অনিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাসের মাঝখানে বসে আছি। উদ্বিগ্ন মন নিয়ে লেখা যায় না, যেখানে প্রতিদিন মৃত্যুর ছায়াগুলি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে চলেছে, সেখানে নিজেকে খুঁজে পেতেও যেন বড় কষ্ট হয়। তবু চলছে সবকিছু, সর্বহারা মানুষটিও সবকিছু ভুলে কখনো ম্লান হেসে ওঠে--হতে পারে তা নিজের অজান্তেই। আসলে মৃত্যু থেকে পালিয়ে বেড়ানই যে প্রাণীর ধর্ম। এই ধ্রুব সত্য মৃত্যুকে কেউ স্বেচ্ছায় বরণ করতে চায় না।

চোখের সামনে সবুজ ঘাস, বসন্তের শিমুল-পলাশ এ সব কিছু পসরার মাঝে আমরা সিঁদুরে মেঘ দেখে আতঙ্কিত হই। কখনো সমস্ত আলো নিভে গেলে অন্ধকারে আঁচড় কেটে আমরা লিখে যাই জীবনের কবিতা।

সমস্ত পথ একই জায়গায় গিয়ে মিশেছে। তবু হাতের কাছে কলম পেলে আমি আমার কথা লিখি, তোমার কথা লিখি, অভ্যাস মত উদ্ধৃত হয়ে যায় সুখ-দুঃখ বিরহের কবিতা। জানি বিয়োগ শেষ কথা নয়। আকাশে বাতাসে অন্তরীক্ষে সহস্র আলোড়নের মাঝে আত্মজনের অন্তর কথা, ব্যথার কথা, আনন্দ-বিরহ-বিয়োগেরকথা গীত হয়ে যায়।

সম্পাদকীয় প্রসঙ্গ লিখতে গিয়ে যেন আজ সব অবান্তর হয়ে পড়েছে। লিখতে লিখতে লেখকের কলম থেমে যাচ্ছে। আবার সে উঠে বসচ্ছে। এই সবই বুঝি প্রদোষকালের লেখা, তালসুরলয়হীন কথা, ছন্দপতনের অপভ্রংশ কথার জোড়াতালি…তবু আমরা লিখব, এই বিদায়ী রাত্রি শেষের হাহুতাশ, শব্দহীনভাষার সঙ্কেত, তবু ধরে নেবো অসুস্থ তাপিত জীবনের প্রলাপ। জনান্তিকে সঙ্গহীন কথা বলে যাব, উন্মাদ উন্মাদনায় খানিক বিহ্বল হেসে নেব, মাতালের মত না হয় অসংযত ব্যথার কথা নিয়ে খানিক কেঁদে নেবো।

কখনো মনে হয়, এই ঘরবেড়ের অন্ধকার ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে এসে দুহাত তুলে চিৎকার দিয়ে বলে উঠি, কোথায় আছো তুমি, হে জীবনদাত্রী, ভাগ্যনিয়ন্ত্রা, তুমি বাঁচাও...আমাদের তুমি বাঁচাও...

সহ সম্পাদক হিসেবে: শমিত কর্মকার--


আমরা আবার একটা কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। সবাই ভেবেছিলাম আমরা বোধহয় ঠিকঠাকভাবে চলছি। আবার সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে আগের মতো। আমরা শুরু করেছিলাম সাহিত্য সভা বই প্রকাশ খুব ভালো লাগছিল। যারা সাহিত্য জগতের সাথে যুক্ত তারা এইগুলো চায় লেখার সাথে সাথে। তাই আবার আবার আমাদের সকলকেই ঠিক থাকতে হবে। যতোটা সম্ভব এই এরিয়ে চলতে হবে। আশা রাখি আবার সব ঠিক হবে হবেই।


সহ-সম্পাদকের কলমে--সাবিত্রী দাস--

পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই মানুষ তার বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে অন্য প্রাণীদের থেকে নিজেকে আলাদা করতে সমর্থ হলেও গোড়ার দিকে প্রকৃতির শক্তি গুলোকে ভয় পেয়ে নতজানু হয়ে সেই শক্তি গুলোর কাছে অবনত হয়েছে বিনম্র প্রার্থনায়।

ক্রমে সময়ের বিবর্তনে মানুষ আবার এগুলিকে করায়ত্ত ও করতে চেয়েছে, আর সেই শক্তিগুলোকে কাজে লাগিয়ে মানুষ আজ মহা শক্তিধর।

প্রকৃতি কিন্তু কখনোই মেনে নিতে চায়না তার সৃষ্টির উপর অন্যের আধিপত্য কায়েম করার চেষ্টা।

রুষ্ট প্রকৃতি তাই ক্ষুব্ধ হয়ে বারেবারে চরম শোধ নিয়েছে,হেনেছে আঘাত! মানুষ তার কৃতকর্মের জন্যই হোক কিংবা অন্য কোনো কারণেই হোক সমগ্র মানবজাতি আজ ভয়ঙ্কর এক পরিস্থিতির সম্মুখে দণ্ডায়মান।

সুস্থ সুন্দর পৃথিবী আজ ভয়ঙ্কর এক অজানা অসুখে পীড়িত। এই পৃথিবী চায় এক অমল আশ্বাস।

মানুষের সঙ্গে মানুষের একটা দূরত্বের ব্যবধান উঠছে ঘনিয়ে। যদিও এই ব্যবধান হয়তো সাময়িক পরিস্থিতির কারণেই তবুও বুকের গভীরে কথাগুলো ছটফটিয়ে মরে, পারস্পরিক ভাব বিনিময় করে হতে চায় ভারমুক্ত। অধীর আগ্রহে ব্যাকুল হয়ে ওঠে প্রকাশের অপেক্ষায়। এরকমই কিছু সুখ দুঃখের সম্ভার নিয়ে সেজে উঠেছে আজকের বর্ণালোকের সংসার।


বুধবার, ৫ মে, ২০২১

বীরেন্দ্র মন্ডল


 


তোমার ঠিকানা 

বীরেন্দ্র মন্ডল 

---------------------

আমি আর স্বরূপ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিলাম আমাদের দল থেকে। কারণ টা কিছুই নয়, স্বরূপ বেশ মোটাসোটা চেহারার। বয়সও আমার থেকে বেশ বড় - মানে ছয় সাত বছর হবে আর কি। সব দিনই ও দলের পিছনে ধীর গতিতে হাঁটে। বেশ একটা ছন্দ থাকে। ওর ঐ হাঁটার ছন্দ দেখে আমাদের দলের কেউ না কেউ আমাদের মূল হাঁটার দল থেকে আলাদা হয়ে এসে ওর সাথে হাঁটে আর ও হাসি হাসি মুখ করে বেশ একটা প্রশান্তি মুখমন্ডলে ছড়িয়ে দেয়। 

      আজ ওর প্রিয় সাথী প্রফেসার শঙ্কর দাসচৌধূরী মাঝপথে ঘরে ফিরে যায় কিছু শাক ও কাঁচা আম কিনে ঘরে দিয়ে আসতে  । তখন সুযোগ বুঝে আমি ওর জায়গাটা নিয়ে নেই। হাঁটছি ওর সাথে কিছু এটা সেটা কথা বলাবলি করে। হঠাৎ দেখি আমি ওর থেকে বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছি একটা তিনমাথা রাস্তার মোড়ে আমি রাস্তার মাঝখানে গিয়ে থেমে গিয়ে পিছন ফিরে ওর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। একটা গাড়ী সামনে থেকে এসে বাঁদিকে টার্ন নিল। গাড়ীর মহিলা-চালিকা একটা সুন্দর হাসি দিয়ে চলে গেল। উনি তো সুন্দর হাসিটা দিয়ে গেল - তোমার চেনা নাকি? আমি বললাম - না, না - আমি চিনি না।

স্বরূপ বলল - তাই কখনো হয় নাকি  - না চেনা হলে তোমার দিকে তাকিয়ে অতো সুন্দর করে হাসলো কেন?  কথাটা ঠিক ভাবার বিষয়। আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো কেন?  আমিও কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়লাম। মহিলার ঐ হাসিতে মনে মনে ভেবে দেখলাম - না, চিনি না। আমি কি ওনাকে কোনো সম্মান দিলাম - আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম আর উনি গাড়ীটা সুন্দর ভাবে ঘুরিয়ে নিয়ে রাস্তাটা পার হয়ে গেলেন। কৃতজ্ঞতা কি জানি। আমরা দু'জন হেঁটে মূল দলে পৌঁছে গেলে স্বরূপ ব্যাপারটা বন্ধুদেরকে বললে তারা প্রথমে খুব একচোট হেসে নিল। হ্যাঁ, ঠিক আছে। নিত্যকারের ব্যাপার, ওসব নিয়ে কার কি দরকার মাথা ঘামানোর। 

 

     আমি সেদিন রাতে খাওয়ার পর প্রায় দশটায় শুয়ে পড়লাম। ঘুম ও এসে গেল। ঘুমঘুম চোখে হঠাৎ দেখি কে যেন বলছে - "ওহে তুমি কি এখানে কাউকে দেখেছো?  আমি দেখছি তখন আইফেল টাওয়ারের নিচে সবুজ ঘাসের উপরে শুয়ে শেষ আলোর শিখার দিকে চেয়ে আছি। ঘুমের ঘোরে বললাম - কাকে? উত্তর এলো ঐ যে দাঁড়িওয়ালা লোকটা - সবাই যাকে ভিঞ্চি বলে ডাকে।

আমি উত্তর দিলাম - ও এখানে কি করতে আসবে - ও তো ইটালীতে থাকে। তখন ও বলল - আমি মোনা, মোনালিসা। পৃথিবীর সবাই আমাকে চেনে। আমি তখন ধড়ফড় করে উঠে বললাম - ও,  তুমি মোনালিসা। পৃথিবী বিখ্যাত তোমার হাসি। ও হ্যাঁ বলল। আমি বললাম - একটা দাঁড়িওয়ালা বুড়ো এসে বিড়বিড় করে মোনা মোনা বলে চলে গেছে অনেকক্ষণ। মোনা বলল - কি অন্যায় বলো তো - আমাকে সৃষ্টি করে কিনা ফ্রান্সের রাজার কাছে বিক্ৰি করে দিল। আর রাজা সেটা লুড্রো  মিউজিয়ামে রেখে দিল। সেখান থেকে পেরুগিয়া আমাকে চুরি করে নিয়ে গিয়ে তার বিছানার নীচে দু'বছর লুকিয়ে রাখলো। কারন, সে মোনালিসাকে ভালবেসে বসেছে। 

এদিকে তোমরা ভারতীয়রা কিন্তু খুব ভাল। ব্রহ্মা যখন শতরূপাকে সৃষ্টি করলেন - তখন তিনি তার রূপে পাগল হয়ে তাকে বিয়েই করে ফেললেন।

আমি তখন ঘুম-ঘুম চোখে বললাম - তাহলে তুমি হাসো না কাঁদো?  ও বলল - আমি বুঝি না। পৃথিবী সারা লোক বলে আমি হাসি। হবে হয়তো। মোনালিসার হাসি। 

 

ঘুমঘোরে আমার হঠাৎ তখন সকালে দেখা মহিলা গাড়ীচালিকার হাসিটার কথা মনে পড়ে গেল। আরে মোনালিসাই তো গাড়ীটা চালাচ্ছিল। আমাকে সুন্দর হাসিটা দিয়ে চলে গেছে। আমি বুঝতে পারিনি। মোনালিসা, তুমি অমনি হাসো কি কাঁদো জানি না। আমরা বলি তুমি হাসো। এই আমাদের সান্ত্বনা । তা না হলে পৃথিবীবাসী আমরা বাঁচবো কি নিয়ে?


শমিত কর্মকার


 


 


আজও ভুলতে পারিনি

শমিত কর্মকার 


সে দিনের কথাটা খুব মনে পরে রামতনু  বাবু বলতেন, লিখছিস লেখ কিন্তু একদিন খুব দুঃখ পাবি। লেখা পড়া একটা মোহ, এই বন্ধনে যে একবার পড়েছে সেই জানে এর মোহ কি। এ যেন এক মায়া জাল ! বেরিয়ে পড়বার ইচ্ছা থাকলেও পারা যায় না।

     ইন্দ্রনীলকে কথাগুলো বলছিলেন রামতনু বাবু। রামতনু চ্যাটার্জী একজন নামকরা মাষ্টার মশাই। পড়ানোর পাশাপাশি তিনি লিখতেন ভীষণ ভালো। গল্পকার হিসেবে তার বেশ নামডাক ছিল। ইন্দ্রনীল ঘোষ ছিল তার ছাত্র। একবার ইন্দ্রনীল একটি পূজাবার্ষিকীর জন্য একটি লেখা আনতে গিয়ে ছিল। তখন তার মাষ্টামশাই মানে রামতনু বাবু জানতে পারেন তার এই ছাত্রটি লেখালেখি করে। 

     ইন্দ্রনীল রামতনু বাবুর বাড়িতে যাওয়ার পর তাকে বসতে বলে। রামতনু বাবু এখন অবসর গ্রহণের পর লেখালেখি নিয়েই ব্যস্ত থাকনে। তিনি সামনের ঘরে এসে বসলেন, সেখানেই ইন্দ্রনীল বসেছিল। শোন ইন্দ্র, লিখছিস বেশ কিন্তু জানিস এই লেখাকে কেন্দ্র করে একজন লেখক কে যখন তুই ভীষণ ভালোবেসে ফেলবি তার কিছু হলে ভীষণ কষ্ট পাবি। জানিস তো লেখকরা একটু হলেও ভাবুক। আর এখন যা পরিস্থিতি চলছে, তার কিছু হলে মনে ভীষণ কষ্ট পাবি। কারন ঐ লেখক তোর কাছে আইকন। তাই বলি বেশি আবেগ তাড়িত হোসনা।আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি।

     আজ রামতনু বাবু নেই। ইন্দ্রনীল এর বারবার তাঁর কথা মনে পড়ে। তিনি তাকে কত রকম ভাবে সাহায্য করতেন। কতো আবদার ছিল তার কাছে। কোন কিছুর জন্য কোন দিন ফেরাননি।চেষ্টা করে গেছেন। আজ তাই বারবার মনে পড়ে কেন তিনি বলতেন একদিন খুব দুঃখ পাবি। 

             ****


মঙ্গলবার, ৪ মে, ২০২১

রূপা বাড়ৈ


 



ক্ষণিকের সাজ       

রূপা বাড়ৈ       

 

সারাদিনের প্রচণ্ড গরমে শরীর থেকে প্রচুর ঘাম ঝরে যাওয়ায় খুব ক্লান্ত লাগছে, তাই দুপুরে খাওয়ার পরে ফ্রিজ থেকে চারটা বরফজমা স্প্রাইট এর বোতল বের করে একটা বালতির মধ্যে করে এনে সিলিংফ্যানের নিচে রেখে বিছানায় শুয়ে পরলাম, ঘরটা একটু ঠাণ্ডা অনুভব হওয়াতেই প্রশান্তির ঘুম এসে গেলো। কতোটুকু সময় ঘুমিয়েছিলাম বলতে পারবো না, এরই মধ্যে স্বর্ণা এসে জোরছে একটা ঠেলা দিয়ে বললো স্বপ্না তাড়াতাড়ি উঠে পড় আর চল মাঠে যাই বিশাল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে ২৬ শে মার্চ- স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কাউন্সিলর আসবেন, মেয়র আসবেন আরো অনেক গুণীজন আসবেন। লাল- সবুজ শাড়ী পরে তারাতাড়ি রেডি হয়ে নে। ঘুমন্ত কর্ণে এইটুকু শুনেই তাড়াহুড়ো করে হন্তদন্ত হয়ে উঠে শুনতে পাচ্ছি মন মাতানো প্রিয় দেশাত্মবোধক গান মাইকে বাজছে। আজ যে অনুষ্ঠান সে তো জানতাম কিন্তু একেবারে ভুলে গিয়েছিলাম। স্বর্ণা লাল-সবুজ শাড়ীর সাথে মিল করে পরেছে হাত ভরে লাল-সবুজ রেশমী কাচের চুড়ি, লাল টিপ, সব রকম মেকাপে সেজেগুজে একেবারে রেডি হয়ে এসেছে। খুব সুন্দর দেখতে লাগছে ওকে, এর আগে কখনো এমন সুন্দর সাজে স্বর্ণাকে দেখি নাই তাই হাঁ করে তাকিয়ে আছি স্বর্ণার মুখের দিকে। এমন সময় হাত টেনে উঠিয়ে বসিয়ে দিলো স্বর্ণা আমায়। মুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে আসার সাথে সাথেই স্বর্ণা সাজাতে শুরু করলো, ওর মতো করেই সাজিয়ে ড্রেসিংটেবিলের আয়নার সামনে নিয়ে বললো এবার নিজেকে দেখ চোখ ফেরাতে পারবি না। সত্যিই বলেছে স্বর্ণা, আমি আয়নায় আমাকে দেখে নিজেই নিজেকে চিনতে পারছি না, আমি যে এতো সুন্দর দেখতে তা কখনো জানতে পারিনি, কারণ আমি কখনো এতো সুন্দর করে আগে সাজি নাই, এই প্রথম এতো সেজেছি। এবার দুজনে একসাথে বেরিয়েছি অনুষ্ঠানে যাবার জন্য, পথে যেতে যেতে দেখছি সবাই লাল-সবুজ পোষাকে সজ্জিত হয়ে যাচ্ছে অনুষ্ঠানের মাঠে। এমন দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে যেন নীল আকাশের নিচে বিশাল এক লাল-সবুজ স্বাধীন পতাকা পতপত করে উড়ছে। আমি মুগ্ধ হয়ে চেয়ে আছি সেই মানব পতাকার দিকে, হঠাৎ মনে হলো একটা সেলফি তুলি স্মৃতি করে রাখতে, সাইডব্যাগ হাতিয়ে কোথাও মোবাইলটা না পেয়ে বুঝতে বাকি রইলো না মোবাইল ঘরে ফেলে রেখে এসেছি। স্বর্ণাকে সেলফির কথা বলতেই ওর মোবাইল বের করে কয়েকটা সেলফি তুলে এগিয়ে যাচ্ছি অনুষ্ঠানের দিকে, কিন্তু শত সহস্র মানুষের ভিড় ঠেলে যাওয়া হলো না সামনের দিকে, তাই অপারগ হয়ে পিছনে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠানের কিছু অংশ উপভোগ করছি আর মাঝে মাঝে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে মনের তৃপ্তি নিয়ে সকলের সাজসজ্জা দেখছি। হঠাৎ দেখি কালো মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ, মুহুর্তেই ধূলো উড়ানো বাতাস এসে ধূলোতে ঢেকে দিলো সমস্ত অনুষ্ঠান, লণ্ডভণ্ড এক হিংস্র থাবায় পণ্ড করে দিলো সব সাজ। আঁধার নামিয়ে ঝড়ো বৃষ্টি ঝরিয়ে সকল মানুষকে করলো হয়রান। আমি স্বর্ণাকে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে ফেলে মনে কষ্ট নিয়ে একা একা ঘরে ফিরে এসে ভেজা কাপড় পাল্টিয়ে এককাপ গরম কফি হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ভাবছি- কেন এমন হয়, কেন সব সৌন্দর্য এক সময় নষ্ট হয়ে যায়।তবে কেন করি বড়াই, কেন করি এতো সাজ, সব কিছুই তো মিছে, সব কিছুই তো ক্ষণিকের অনুভব।


সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়


 


প্রতিবিম্ব

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়


কি কান্ড! কি যে হয়েছে রায়হানের, কে জানে? 

রায়হান আজকাল প্রায়-ই আরেক রায়হান- কে  দেখতে পায়। অবিকল ওর মতো দেখতে, ওর মত কথা বলে, হাসে। সেই রায়হান ওর পিছু ছাড়ে না একেবারে।  কখনও ছায়া হয়ে ওর সাথে যাচ্ছে,  সেইসময় ছোট হয়ে বা কখনও বড় হয়ে পা মেলাচ্ছে। কখনও তো আয়নায় দাঁড়ালে এসে বিদ্ঘুটে হাসছে। আর হাসির শব্দটাই বা কেমন যেন।  খ্যাঁক! খ্যাঁক! রায়হান যখন বিরক্ত হয়ে মুখ ভেঙচায় আয়নায়, ওমাঃ সেও তাই করে যে। ওকে আবার রাগাবার জন্য কখনও বলে, 'মুখে পুরো ইলিশ মাছের গন্ধ।' আর নয়ত বলে, 'মুখটা পুরো জঙ্গল দেখাচ্ছে।' মাথায় হাত দিয়ে বলে, 'চুলগুলো তো একেবারে উড়নচন্ডী।' ত্যুত কি সব বলে কে জানে।

 ও যত মুখ ব্রাশ করে, সে তত বলে চলে, 'হচ্ছে না। আরো পরিষ্কার কর। নয়ত নুন আর সড়ষের তেল মিশিয়ে মাজ দেখি'- দাড়ি কামিয়ে ফেলল পুরো ইলেকট্রিক রেজার দিয়ে...তাও বলে চলে, 'ওরে হয় নি। ভালকরে নিজের মুখ দেখ।'

নিজেকে দেখুক না, ওকে নিয়ে পড়েছে কেন কে জানে? এক এক সময় মনে হয়, কেন এরকম হচ্ছে? আর যত এইসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে তত যেন নিজেই নিজের মধ্যে সেঁদিয়ে যাচ্ছে।  

আবার জ্ঞ্যান-ও দেয়  যখন আয়নায় এসে দাঁড়ায়। শুনতে পায়- 'দরকার মতো পালাবার পথ পরিষ্কার রাখ। তোকে পালাতে হবে। আর পালাবার সময় পিছন ফিরে তাকাবি না কিন্তু। তাকালে আর রক্ষে নেই। একেবারে তুই আমি দুজনাই গায়েব হয়ে যাব।'

'তুই আমি' এই দুজন-এর অর্থ কি? দুজন রায়হান মানে পৃথক রায়হান নয়-একজনেরই দুই ভাগ? এক অর্ধ দাঁড়িয়ে আছে, তো আরেক অর্ধ তার পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে না কেন? কি অদ্ভুতুরে কান্ড রে বাব্বাঃ। দুই থেকে এক হতে বাধা তো নেই। অনেকসময়, বোধহয় সব সময়ই, এই দুই ভাগে মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে। শেষমেষ হয়ত মৃত্যুতে গিয়ে মেলে-মেশে।  


         ***



 

প্রেরণা বড়াল


 

 

মন হরণ

---------------------------

প্রেরণা বড়াল 


ও কাকি দরজা খোল,শিগগির দরজা খোল।

আসছি, সাড়া দেয় নির্মলা। ভীতর ঘর থেকে বৈঠক ঘরে আসাতে আসতে সুনতে পায় শিবু,গোপাল, আরো অনেকে চেঁচাচ্ছে।

"পারেও বটে বাচ্চারা।" 

ওর একমাত্র ছেলে নীলমণিকে নিয়ে এই ঘন্টা খানেক হলো খেলতে বেরিয়েছিল। 

এই ফাঁকে ঘরের কাজ গুছিয়ে সবে রান্না করতে বসেছে। আজ রবিবার, অফিস ছুটির দিন। মা ছেলে বেশ জমিয়ে খাবার দিন। দুই কুলে ওই ছেলে ছাড়া আর কেউই নেই নির্মলার। ছোট বেলায় মাকে হারিয়েছে আর বিয়ের পর বাবাকে।  সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিয়ে হয়েছিল তার। শাশুড়ি মা খুবই ভালোবাসতেন ওকে। কিন্তু কপাল খারাপ, তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতেই জীবনে কঠিন সময়টা দেখতে হল তাকে। মনহরণ আর নির্মলা, ওরা স্বামি স্ত্রী সে দিন দুজনেই খুশি খুশি অফিসে বেরিয়ে গিয়েছিল ছেলেকে আয়ার কাছে রেখে। রোজ যেমন যায়। কিন্তু ফিরে এসেছিল ও একা । মনহরণ আর কোন দিন ফিরে আসে নাই। অবশ্য শোবার ঘরে বালিশের নিচে ওর একটা চিঠি পেয়েছিল। তাতে লেখা ছিল "আমি গৃহী হতে চাইনি কিন্তু মায়েরও অবাধ্য হতে পারিনি। চেষ্টা করেছি তোমাকে ভালো রাখার। মা বেঁচে নেই, ছেলের ও তোমার জন্য ব্যাংকে কিছু টাকা জমা আছে। 

আশা করি দায় দায়িত্ব থেকে মুক্ত হতে পেরেছি। ঈশ্বর তোমাদের মংগল করুন।" 

সত্যি, যে মানুষটার ভালোবাসায় ও পরিপূর্ণ ছিল, যার ভালবাসাতে এতটুকুও কমি ছিল না। সেই মানুষটি, কি করে ওদের ছেড়ে চলে যেতে পারল, আজ ও বুঝে উঠতে পারে নি নির্মলা। 


সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে, বৈঠকে এসে দরজা খুলতে না খুলতেই হুড়মুড় করে সবাই ঘরে ঢুকে পড়ল। এক বাবা গোছের লোক নীলমণিকে দিবানের উপর শুইয়ে দিল। 


"কি হয়েছে ওর? কথা কইছে না কেন ? ওকে কোলে করে কেন আনতে হল। "


না আর মাথা কাজ করছে না নির্মলার। মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। বাচ্চাদের কথাগুলি মনে হচ্ছে দিগন্তের পার থেকে ভেসে আসছে। ওরা বলছে "আজ এই সাধু বাবার জন্য নীলমণি বেঁচে আছে। আমাদের খেলার বলটি পানা পুকুরে পড়ে, আর ওটাকে আনতে গিয়ে, নীলমণি পুকুরে পড়ে ডুবে যাচ্ছিল। "

নির্মলা যেন অসাড় । হঠাৎ সাধুবাবার কথায় যেন বিদ্যুতের ঝটকা লাগল। হ্যাঁ ও পরিষ্কার সুনতে পেল। উনি যাবার আগে বললেন, 'কোন ভয় নেই, আগামীতে একটু সাবধানে থেকো।' এই গলাটা তো ওর চেনা মনে হচ্ছে। কে এই সাধু? ওনার  চুলদাড়ি না থাকলে কেমন দেখাত? কে ইনি? কে?কে?



 

অগ্নিশ্বর সরকার


 


গন্ধ রহস্য

অগ্নিশ্বর সরকার

 

-শিবু কাকা আজ আবারও সেই পচা গন্ধটা পাচ্ছো না? সেই পরশু রাত থেকেই পাওয়া যাচ্ছে গন্ধটা। কাল কি একবার কালী ওঝাকে ডাকবে? বোধ হয় কোনও অপদেবতার নজর পড়েছে আমাদের  বাড়িতে। 

খাওয়া শেষ করে দাওয়ায় বসে অনুপম তার ছোটকাকা শিবুর সাথে আলোচনায় মগ্ন। বর্ধমানের ইদিলপুরের এক স্বচ্ছল চাষি পরিবারের সদস্যরা আজ চিন্তিত। অনুপম সাহা বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে পাশ করে পারিবারিক জমির চাষবাসের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছে। সাথে বাড়ি লাগোয়া একটা জমিতে দেওয়া সার-কীটনাশকের দোকান খুলেছে। পারিবারিক জমিতে চাষবাস করা ছাড়াও বাড়ির পিছনের বাগানের এক অংশ পরিষ্কার করে নিজের উদ্যোগে কিছু সব্জি চাষও করেছে। খুব সুখী পরিবার। কিন্তু গত দু-দিন ধরে এই মড়া-পচা গন্ধটা সেই সুখের সংসারে একটা অস্থির পরিবেশ তৈরি করেছে। ওদিকে ছোট ভাইয়ের বউ দশ-মাসের প্রেগন্যান্ট। চিন্তা তাকে নিয়ে সবথেকে বেশি। যদিও একবিংশ শতাব্দীতে এইসব কুসংস্কারের কোনও জায়গা নেই, তবুও এই গ্রাম্য পরিবেশে আজ অনুপমও এইসবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। 

- অনুপম কালই আমি কালীর বাড়িতে যাচ্ছি। আমি বললেই আসবে।

- কাকা, আমি তো কাল সারাদিন পূর্ব-পাড়ার জমিতে আলু তোলা নিয়ে ব্যস্ত থাকবো, তুমিই বাড়িতে থেকো। 

- তাই হবে খন। 

কথায় কথায় রাত এগিয়ে চলল। রাত গাঢ় হওয়ার সাথে সাথে গন্ধের তীব্রতাও বেড়ে চলল। 

পরেরদিন দুপুরে পাড়ার একটা ছেলে ছুটতে ছুটতে অনুপমের কাছে গেল।

- দাদা শিগগিরি বাড়ি যাও। তোমাদের বাড়ির বউ এবার বুঝি মরে যাবে।

সব কাজ ফেলে রেখে অনুপম বাড়িতে কোনওমতে পৌঁছল। বাড়িতে গ্রামের লোক ভেঙে পড়েছে। কালীওঝা তারস্বরে চিৎকার করছে। ভিড় ঠেলে অনুপম কোনওমতে ছুটল অন্দরমহলে। ছোটবউ অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। বাড়ির মধ্যে একটা চাপা গুঞ্জন, বৌকে ভুতে ধরেছে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সেই মড়া-পচা গন্ধটা। অনুপম কিছুক্ষণ কিংকর্তববিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। প্রকৃতিস্থ হল সনতের ডাকে। সনৎ লক্ষ্মী মাষ্টারের ছেলে, এইবার উচ্চ মাধ্যমিক দেবে।

- অনুকাকু, তুমি ছোট কাকিমাকে নিয়ে এখনই বর্ধমানের হাসপাতালে ভর্তি করো। আর তোমাদের বাড়িতে এতো পচা গন্ধ কিসের? কালীওঝাকে কেন ডেকেছো?

সম্বিত ফিরল অনুপমের। শিক্ষিত হয়ে এটা কী করে করতে পারে সে? এখন এসব ভেবে সময় নষ্ট করার সময় নয়।

- সনৎ, তুই এখুনি হেমেনদের গাড়িটা নিয়ে আয়। বর্ধমান যেতে হবে।

সনৎ তৎক্ষণাৎ ভিড় ঠেলে ত্বরিতগতিতে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শিবুকাকাকে সাথে নিয়ে বাড়ির ছোটবউ আর অনুপমের বাবা-মা রওনা দিল বর্ধমান হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। 

সন্ধ্যে থেকে সাহা বাড়িতে আনন্দ দু-গুণ। একটা অবশ্যই বাড়িতে নতুন অতিথির আগমন। হ্যাঁ, বাড়ির ছোটবউ সন্ধ্যের সময় হাসপাতালে ফুটফুটে একটা কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছে। দ্বিতীয়টা অবশ্যই সেই গন্ধের রহস্য সমাধানের জন্য। সনতের বাবা লক্ষ্মী মাস্টার বিজ্ঞানের শিক্ষক। পাড়ার কিছু উৎসাহী ছেলে নিয়ে কালী ওঝাসহ গ্রামবাসীকে অনুপমদের বাড়ি থেকে বিতাড়িত করেন। এরপর অনুপম ও সেই ছেলেগুলি নিয়ে গোটা বাগান খুঁজতে শুরু করেন। উদ্ধার করেন বাগানের এক কোণে থাকা একটা অচেনা বিশাল ফুল। ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখা যায় ওটি আসলে ওলের ফুল। তিনি বলেন,

-আমরা খাবার হিসেবে যে ওল ব্যবহার করি যার বিজ্ঞান সম্মত নাম আমোফফালাস টাইটেনিয়াম, তারই পুষ্পমঞ্জরী এটি। অত্যধিক গরমে বংশবিস্তারের জন্য অনেক সময় ওল গাছে এই ধরণের পুস্পমঞ্জরি দেখা যায়। অনেক সময় মাটি থেকে ওল তুলে নেওয়ার পরও ওলের শিকড়ের অংশ কিছুটা থেকে যায়। যা থেকে পরে ফের মাটির তলায় ওল জন্মায়। এই ভাবে বংশবিস্তারের জন্যই পুষ্পমঞ্জরী তৈরি হয়। 

আজ রাতেই অনুপম সিদ্ধান্ত নেয়, কালই দোকানঘরের পাশের ঘরে একটা বিজ্ঞান সচেতনতা ক্লাব খুলতে হবে। গ্রামের মানুষ তবেই তঞ্চকতার হাত থেকে বাঁচবে।



 

রূপালী মুখোপাধ্যায়


 

 

অনুভব 

রূপালী মুখোপাধ্যায় 

 

আজকাল প্রায়দিনই নানা অজুহাত দেখিয়ে কামাই করছে নমিতা , আমি আর পারছি না । কামাই যেন নমিতার নিত্য রুটিন হয়ে যাচ্ছে । 

এইসব ভাবতে ভাবতে রুমি স্নান করতে গেল । কাজ করতে করতে আজ স্নান করতেও দেরী হয়ে গেল । তাড়াতাড়ি স্নান সেরে ব্যালকনিতে ভিজে  শাড়ি মেলতে গিয়ে দেখলো একটি বয়স্ক লোক ঘাড়ে করে একটি লোহার মেশিন নিয়ে হেঁটে চলেছে আর অস্ফুট স্বরে কিছু একটা বলছেন । দেখে বোঝা গেল ছুরি কাঁচি ধার করেন । হটাৎ রুমিদের পাশে তিনতলা বাড়ি  থেকে ডাক পড়লো । ভদ্র লোক আবার পিছিয়ে এসে উপর দিকে তাকালেন । উপর থেকে শোনা গেল জয়ার মায়ের গলা । এই কাঁচি টা ধার করতে কত লাগবে ? উনি বললেন মা ষাইট টাকা দিবেন ।  নানা অত পারবো না , তিরিশ টাকায় হবে ?  না মা পারবো নি । তবে করে দাও,  আর পাঁচ টাকা বেশী দেবো । না মাইজী পারবো নি , বলে ভদ্র লোকটি আবার হাঁটতে শুরু করলেন । 

 

রুমির ভদ্র লোকটিকে দেখে কষ্ট হলো , ভাবলো ডাকি , এমনি এমনি তো ডাকা যায় না । একটি ছুরি সান দেওয়ার নাম করে ডাকলো । 

লোকটি বললেন দ্যান মা কি ধার করতি  হবে । 

লোকটির  কথা বলার ক্ষমতা নেই , হাঁপাচ্ছেন । 

বলেন দেখ মা কাজ পাই নে  , খুব কমজন ডাকেন । তাও আবার অত কম দিলে করি ক্যামনে কন  । আমাদের তো খেতি হবে বলেন মা । আপনি একটু জল খাবেন ? তা দিলে একটু খাই । ঠিক আছে এই ছায়াটায় বসুন আমি জল আনছি । রুমি একটি থালায় দুটো রুটি আর একটু তরকারি দিয়ে বলে ,খান তারপর আমার এই ছুরিটা ধার দিয়ে দেবেন । মিস্ত্রি মশাই একটু কিন্তু কিন্তু করলো তারপর খেয়ে নিলো । 

আপনি থাকেন কোথা ? রুমি জিগ্যেস করলো । বললেন  এই শিব মন্দিরে গো এম এম সিতে , ওখানেই লেবারের কাজ করতাম । ওটা তো বন্ধ হয়ে গেল তারপর থেকে এই কাজই  করি মাইজী । আর পারি না এই ভারী মেশিন নিয়ে গোটা এলাকায় হাঁটা আবার পা দিয়েই মেশিন টা চালাতে হয়। খুব কষ্ট হয় গো মাইজী । দ্যান ছুরিটা দ্যান , ধার করে দিই । 

আচ্ছা আপনি তো একজায়গায় বসে কাজটা করতে পারেন ? সে রকম জায়গা পাইনি গো মাইজী । আপনি যদি আমাদের এই কালি তলার একপাশে বসেন ? সেকি বসতি দিবে গো মাইজী ? ঠিক আছে আমি কথা বলবো । আপনি সামনে সপ্তাহে একবার আসবেন । রুমি সমাজ কল্যাণ দপ্তরে কাজের সূত্রে কাউন্সিলরের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ ছিলো । কাউন্সিলর কে বলে একটি ছোট্ট চালা বানিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিলো রুমি । 

তারপরের সপ্তাহ  থেকে মিস্ত্রি মশাই ওখানে বসেই কাজ করেন  , প্রথমে ভালো কাজ পায় নি তারপর থেকে মোটামুটি চলে , তাতে ওদের দুজনের চলে যায় । ছেলে বৌ আলাদা থাকে , ওদের দেখে না । খোঁজও রাখে  না ।  তার জন্য মিস্ত্রি মশাই এর কোন রাগ দুঃখ নেই । ওর মায়ের একটু  দুঃখ আছে । ছেলে একটা কারখানায় কাজ করে । রুমীর ব্যবহারে জন্য রুমিকে ভদ্রলোক খুব শ্রদ্ধা করে  , ভালোও বাসেন । নিজের মেয়ের মতো মনে  হয় বলেন আমার তো কিছু দেওয়ার নেই , কি দিব মা আপনাকে ? 

রুমি বলে দেওয়ার নেই বললে তো চলবে না । দিতে তো হবেই আপনাকে। কি দিব মা আমি ? 

থাকলে নিচ্ছই দিতুম । আপনি আমার জন্য এতো করলে আমি কিছু দিতুম না  ? বিশ্বেস করেন মা আমার কিছুই নেই । রুমি বলে কেন আপনার কাছে আশীর্বাদ নেই ? ওটাই আমার চাই । দিতেই হবে আপনাকে । তখন মিস্ত্রি মশাই হেসেই খুন । অনেক অনেক আশীর্বাদ করি মা , আপনে সুখী হন , ভালো থাকেন , সুস্থ থাকেন । 

আমার আশীর্বাদে কাজ না হলে আল্লা করবেন মা , আল্লা করবেন ।



 

শ্যামাপ্রসাদ সরকার


 


 সঞ্জয়ের দিদা

**********

শ্যামাপ্রসাদ সরকার

 

 

ভাই  জ্বরে বেঁহুশ। ঘরে  আমি,দাদু আর সঞ্জয়ের দিদা। সঞ্জয়ের দিদা  ভাইকে  দেখাশোনা করত। বড়মামার বৌভাত, না গেলেই নয়,  অতিকষ্টে মা আর বাবা তাই গেল।

 

*******

ভাইটাকে বুকে জড়িয়ে আছে বুড়ি। তার গা-হাত কোঁচকানো চামড়ায় ঢাকা।  ওর সঞ্জয়কে আমরা কেউ দেখিনি কখনো। ওষুধ খাওয়ানো, জলপট্টী সব সে-ই করল। 

 

আর বিড়বিড় করে কি সব জপটপও করছিল,  মনে আছে। 

*******

 

বাবাদের গাড়ি যখন থামল তখন রাত্রি আর ভাইএর জ্বর দুইই চলে গেছে। মা এসে দেখল সঞ্জয়ের দিদা ভাইকে বুকে জড়িয়ে ঘুমে ঢুলছে!

 

**********

সেবার খবরের কাগজ আসতে ভাই হৈ হৈ করে উঠল। কাগজে নাকি  'সঞ্জয়ের দিদার ছবি' বেরিয়েছে! সবাই একচোট হাসল। 

 

আরে, গর্দভ ! ওটা তো মাদার টেরিজা রে!

 

ভাই কিন্তু ঠিক দেখেছিল, আমিও...

 

হ্যাঁ, ওটা সেই সঞ্জয়ের দিদাই.....!

 

***********



 

মনীষা কর বাগচী

 



 



মাসি

মনীষা কর বাগচী 


ক পথ দূর্ঘটনায় বাবা মাকে হারিয়ে কৌশিক মাসির কোলে ঠাঁই পেল। মাসিও যেন তাকে পেয়ে হাতে স্বর্গ পেল। নিঃসন্তান বিধবা মাসি কৌশিককে বুকে টেনে নিল।

দাদা বৌদির সংসারে অশান্তি হতে পারে ভেবে মাসি কৌশিককে নিয়ে চলে গেল শহরে। সেখানে  একটা রেডিমেড কাপড়ের কারখানয় কাজ নিল। দিন রাত পরিশ্রম করে কৌশিককে মানুষ করতে লাগল মাসি।

কৌশিক মাসির কষ্টটা বুঝতে পেরেছিল। বড় হয়ে মাসির কষ্ট দূর করতে হবে তাই সে খুব মন লাগিয়ে পড়াশোনা করতে লাগল।

এখন অনেক বড় হয়েছে কৌশিক ।লেখা পড়া শিখে বড় চাকরি পেয়েছে। মাসিকে সে কোনো কাজ করতে দেয় না এখন আর। আনন্দে মাসির চোখে জল গড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কৌশিকের সামনে চোখের জল‌ও ফেলতে পারে না , সে যে তার মাসির চোখে জল সহ্য করতে পারে না। 

মাসি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে সকল ঘরের কৌশিক‌ই যেন এমন‌ হয়...

মাসি কৌশিকের অবলম্বন কি কৌশিক মাসির বেঁচে থাকার আশা বিষয়টি ভাবিয়ে তোলে। কে যে কখন কার অবলম্বন হবে কিছুই বোঝা যায় না...


ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়


 

জীবন সংগ্ৰাম

ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়


এ জায়গাটাতে প্রতিদিন আসে ছোট্টছেলে দুটো।এর নাম হাওর বিল।এখানে আকাশ টা নীলিমায় নীল।যত হারিয়ে যাওয়া হৃদয়রত্ন এখানে খুঁজলে পাওয়া যায়।দিগন্ত ছোঁয়া প্রান্তর।মাঝখানে হাওর।বিলের চারপাশে স্নেহছায়া।বট,অশুত,জাম আর তালগাছের সারি।প্রকৃতি মা যেন এখানে আঁচল বিছিয়ে রেখেছেন তাঁর মাটির সন্তান দের জন্য।এমন মায়া যেকোনো মানুষের চোখে কাজল পরিয়ে দেয়।

তমলুকের কাছে এই গ্ৰামের নাম গোবিন্দ পুর।গঞ্জের বাজারে আজ বরফের মাছ এসেছে।এখানে বরফের মাছ খুব একটা আসে না।তাই বাজার খুব সরগরম।নিত্যানন্দ আড়তদার।হিসেবের খাতা নিয়ে বসে আছে।

সোনা আজ মাছ মাপছে।পাইকেররা কিনে আরো দূর গাঁ এ বিক্রি করবে ইচ্ছেমতো দামে।সোনা বললে "কত্তা।আমার পোলা দুটোরে এটুনি মাছ দিলে খাত।ওটার য্যান দাম ধরবা নি"।

নিত্যানন্দ চোখ কপালে তুলে বললে "মাগনায় মাছ খাত।কি আহ্লাদে কথা।ওসব হবে নি।একটা কিষানের রোজ  আবার মাছ।ব্যাওসা লাটে উঠবে।"

সোনা বলে "মা নক্কী তোমায় রন্ন দেছে আমাপা।ওটুনি দিলে তোমার ভালো হবো গো।"

নিত্যানন্দ বলে "ওইজন্য তোদের কাজ দিই না।গাছের ও খাবি,তলার ও কুড়বি।কতদিকে তোর আয় ।আর নাকে কাঁদস"।

একটা দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে সোনার।সত্যি কী ছিল আর কী হল।এই চৈত্রমাসে এখন ও কোনো বায়না এল না।আটটার মধ্যে মাছ মাপা শেষ হল।নিত্যানন্দ টাকার কুমীর।তবু গড়িমসি করে হাত কাঁপিয়ে বললে "এই নে।পঞ্চাশটা টেকা।"

সোনা বললে "ওটুকু তে হবে না গো কত্তা।আর একটা দাও।ঘরে ভুখাদানা নেই।ছেলেটার কঙ্কাল সার দেহ।আমাকে ওটুকু দিলে কমবে না গো তোমার।"

নিত্যানন্দ মুখ বেঁকিয়ে তাচ্ছিল্য করে বললে "এই জন্য তুদের কাজে নিই না।একটু লোভ সংবরণ করতে শেখ।এই নে।কুড়ি টেকা রাখ।আর শোন।কাল ঠিক ভোর তিনটেতে আসবি।বুঝলি।"

বাজার বেলার দিকে সরগরম।সোনার নজর গেল শুঁটকি মাছের দিকে।কম পয়সায় শুটকি মাছ কেনাই গরীব গুর্বোদের ভালো।বললে "এই কেনারাম।শুঁটকি দে কুড়ি টেকার"।

পানখাওয়া দাঁতে হাসির ফোয়ারা কেনার।বলে নে যাও সোনা দা।খুব ভালো আমদানি আজ।"।

বাড়িতে গিয়ে দেখল মা বেতের কাজে ব্যস্ত। বললে "মা।কিছু খেয়েছিস।দুকান থেকে বোঁদে এনিচি।মুড়ি দিয়ে খা।"

ছেলেকে দেখে উঠে রান্নাঘরে গেল সরমা।বললে "তুই নেয়ে আয়।বৌ গোবরমাটি ন্যাতা দেছে দোয়ারে।এখন চান করে ফুল তুলছে।পুজো হলে রান্না চড়াবে।তুই চাল এনিচিস।ঘরে যে দানাপানি নেই।আমি ছুটে যাই।হাবুলকে হাঁক পাড়ি।"

সোনা অবাক হয়।বলে "হাবুল কোথায় গেছে?সকালে পড়তে বসে নি!

মা বলে "তাইলেই হয়েছে।এমনি পড়ে না।তার উপরে আজ পুজো।চন্ডীমন্ডপ এ বিশ্বেসরা পুজো দেছে।"

সোনার মনটা চন্ডীমন্ডপ এর পানে চলে যায়।ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে ও।সন্ধ্যা হলেই মোড়লদের চুলোচুলি।সারাদিনের কর্মকাণ্ড আলোচনার মোক্ষম জায়গা।শুধু কি তাই!মনে পড়ে গেল পন্ডিত মশাইকে।চন্ডীমন্ডপ এ পাঠশালা বসতো।পড়া না করলেই ঠ্যাঙানির নাম ধনঞ্জয়।আবার গাঁ এর পূজো আচ্চাতে চন্ডীমন্ডপ ভরসা।

হাবুল ছাগল চরাতে হাওর বিল গেছে।সাথেআছে তপে।হঠাৎ কানে এল ঠাগমার ডাক।"হাবুল রেএএএএ"।

হাবুল বলে "চল তপে।তাত বাড়লে আর থাকা নয়।চন্ডীমন্ডপ এ আজ পুজো।বিশ্বেসরা মানত করেছিল।ওখানে মেলা বসেছে।"

তপে উৎফুল্ল হয়।বলে "মেলা!আমার খুব ভালো লাগে।কি কি দুকান বসেছে?"

হাবুলের চোখদুটো চকচক করে।বলে "মণিহারী দুকান।কত কি বিক্রি হচ্ছে।খেলনার দুকান।চপ ভাজা"।

হাবুল বললে "আমাদের বাড়ি আসবি।দুজনে মেলাতে ঘুরবো।"

তপে ঘাড় নাড়ে।ছাগল নিয়ে বাড়ি ঢোকে হাবুল।ভাত ফোটার গন্ধটা হাবুল কে মাতাল করে দেয়।আজ সকাল সকাল রাঁধা হচ্ছে।

ছাগল চালায় ছাগলদের বেঁধে জল দিল হাবুল।তারপর হাত পা ধুয়ে এল ।ঠাগমা বললে "সকাল থেকে মানিক আমার উপোস করে আছে।খেয়ে নে বাছা"

হাবুল দেখে আজ একটা উৎসবের আনন্দ বাড়িতে।বলে "বাটিতে কী দিলি ঠাগমা।এত বোঁদে।কোথায় পেলি"

ঠাগমা ফোকলা দাঁতে হাসে।বলে "তোর বাপে আনছে"।

সোনা ঢাকির ভালো নাম সঞ্জয় বারিক।আজ কত পুরুষ ধরে ওরা ঢাক বাজায়।আর এখন।বেঁচে থাকার জন্য কত খড়কুটো আঁকড়ে ধরছে ও।ঢাক বাজানোতে কত আভিজাত্য।তবে পেটে খিদের বাজনা বাজলে মানুষ সব করতে পারে।

সোনা বৌ কে বললে "আজ মেলাতে দুকান বসাবো।একটা মাচা বাঁধি গে"।

বৌ বলে "তুমি দুকান দেবে।কি দুকান?"

সোনা বলে "গঞ্জের বাজার থেনে  ঘুগনির মটর আনি।তুই পেঁজ রসুন দিয়ে করে দে।সাথে পাঁউরুটি।চা।কি রে?পারবি নে?"

বৌ হাসতে হাসতে বলে "বেশ হবে।কটা পয়সার মুখ দেখতে পাবে।আমি রান্না করে উনানে ন্যাতা দেবো।ঘুগনির মটর ভেজাতে হবে নি?যাও।নে এসো সব"।

সোনা বলে "চল হাবুল।দুজনে যাই"।

আজ সকাল সকাল রান্না হয়েছে।হাবুল বলে "আজ কি রাঁদলি মা"?

মা এর মুখে অনেক দিন পর হাসি।কী সুন্দর দেখাচ্ছে মা কে।হাবুল বললে "তোকে আজ দুগ্গা মা মনে হচ্ছে।"

মা বলে "আজ শুটকি মাছের ভর্তা আর শাকভাজা রেঁদেছি"

হাবুল বলে "দারুণ!অনেক ভাত খাবো আজ"।

ছেলে,স্বামী আর শাউরিকে খেতে দেছে অপর্ণা।বেশ আত্মতৃপ্তি আজ।

হাবুলের ঠাগমা বিশ্বেস বাড়ি গেল।ওরা বলেছে "আনন্দনাড়ু করবো কাকীমা।বিকেলে এসো।"

বিশ্বেস গিন্নি বলে "শরীল গতিক কেমন?"

সরমা মনমরা হয়ে বলে "আর কেমন থাকবো গো দিদি।সংসারে বড় অভাব।খেতে পাই না পেটপুরে।ওষুধ পত্র কিনতে পারি না"।

বিশ্বেস গিন্নি বলে "অভাব এখন থাবা বসিয়েছে।সর্বত্র আতঙ্ক"।

সরমা বলে চলে "পৃথিবীতে মারণরোগ বাসা বেন্দেছে।পিত্যেক বছর পুজোতে ঢাক বাজিয়ে কত উপায়।চৈত্রমাসে বায়না হয়ি যায়।বোম্বাই,নেপাল কোথায় না যায় ছেলেটা ঢাক বাজাতে।গাড়িভাড়া,খাওয়া সব দেয়।সাথে চল্লিশ হাজার টেকা শুধু দুগ্গা পুজোয়।গত সনে গেল।এই সনেও তাই।এখন কী করে বাঁচবো বৌ ছেলে পুলে নিয়ে।"

বিশ্বেস গিন্নির মনে খুব দয়া।চাল ,আলু,আর টাকা দেয় সরমাকে।সরমা বলে "আলতা পরিয়ে দি মা।একটা পেন্নাম করি তোমায়"।

বড় খুশির দিন আজ।তপেটাও হাজির।দুজনেই হাঁক দিচ্ছে মেলায় "আসুন।আসুন।ঘুগনি,রুটি,চা সব পাবেন।"

সবাই আজ দোকান টা নিয়ে মেতে আছে।হাসিমুখে সংগ্ৰাম করছে ওরা। জীবনসংগ্ৰাম।


 

 



সোমবার, ৩ মে, ২০২১

ডাঃ অরুণ চট্টোপাধ্যায়

 


 

বিষণ্ণ বিকালে

-ডাঃ অরুণ চট্টোপাধ্যায়

 

তিনদিন আগে শেষ বাঁধনটাও চলে গেল। গোকুলের মা সকলের মায়া কাটিয়ে চলে গেল। রেখে গেল একটা বিরাট শূন্যতা। 

সে প্রতিবাদী নয় তাই হিন্দু নিয়ম অনুসারে কাছা গলায় করেছে। নিয়ম অনুসারে দিনে একবার স্বপাক খায়। সে যে বিরাট ধার্মিক তাও নয়। তবে সর্বদা যেন কে তাকে বলে যাচ্ছে মাকে তুমি অবহেলা করছ না তো? 

মা নেই এটা বিশ্বাস যেন এখন সে করতে পারে না। যেন মনে হয় নিয়ম পালনে অবহেলা মাকে অবহেলার সামিল। মনের মধ্যে একটা কাঁটা শুধু খচখচ করতে থাকে।

আজ সারা দুপুর বৃষ্টি হয়েছে। তুমুল বৃষ্টি। বিকেলের দিকটায় ধরেছে। আকাশ এখনও তেমন পরিষ্কার নয়। পশ্চিম আকাশে মেঘটা ছিঁড়ে ফালা করে সূর্যটা মুখ বাড়িয়েছে। দুর্বল রোদের আলো মেঘে মেঘে প্রতিফলিত হয়ে ছিটকে আসছে।

মা তো ভুগছিল সেই কবে থেকে। তার যখন সতের বছর বয়েস তখন বাবা হঠাৎ মারা যাবার পর থেকেই মা শয্যা নিয়েছে। ভাগ্যি বাবার ফ্যামিলি পেনশনটা ছিল তাই পড়াশোনাটা কোনমতে চলেছে। 

কলেজে প্রেম করা হয়ে ওঠে নি। সে সাংঘাতিক ভাবে এড়িয়ে এড়িয়ে গেছে। তাই কেউ তার সঙ্গে মিশত না। কেউ নোট দিয়ে বা বই দিয়ে সাহায্য করত না। কেনার সাধ্য ছিল না গোকুলের। সরকারী চাকরি হলেও বাবার চাকরিটা তো বিরাট কিছু ছিল না যে ফ্যামিলি পেনশন একটা বিরাট মাপের হবে। 

কলেজ আর বাড়ি এই ছিল তার জীবন। অসুস্থ মা তো কিছুই করতে পারে না। এক টুকরো মাছ যার কাছে বিরাট বিলাসিতা তার পক্ষে প্রেমিকা নিয়ে রেস্টুরেন্টে ঢোকা অসম্ভব। তবু প্রেম তো যৌবনের দরজায় উঁকি পাড়বেই। মানুষ তো কোনও ইঁট  পাথর দিয়ে গড়া নয়। একুশ বছরে নীলা এসেছিল। দরিদ্র মেয়েটি অনেক করে বলেছিল, চিন্তা কিসের আমরা আধপেটা খেয়ে থাকব। আমি মায়ের দেখাশোনা করব আর তুমি একটা চাকরি বাকরির চেষ্টা করবে। 

নীলাকে সত্যি ভালবেসেছিল গোকুল। এই প্রচন্ড দারিদ্রের দরিয়ায় নিজের সঙ্গে তাকেও ভাসিয়ে দিতে মন চায় নি। চাকরি খোঁজা দুঃসাধ্য। অসুস্থ মাকে কোথায় রেখে যাবে? এদিকে মায়ের কিছু হলে তো পেনশনটাও আর থাকবে না।

আজ গোধূলিটা এসে পড়েছে অনেক আগে। হয়ত আকাশ আবার মেঘে ঢাকবে। পরে সুযোগ পাবে না বলে আগেই একটা টুকরো ছিটকে এসেছে।

সাতান্ন বছরের গোকুলের চোখে মুখে এখন অস্তগামী সূর্যের আলো।

নিচে কার যেন গলার আওয়াজ। নীলার নাকি? আগ্রহের সঙ্গে ছুটে গেল কার্নিশের দিকে। মুখ বাড়াল রাস্তায়। না নীলা নয়। নীলার মতই অসংখ্য নীলা চলেছে তাদের বর বাচ্চা নিয়ে। 

নীলার বাবা অবশ্য অপেক্ষা করে নি। এক শিক্ষকের সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। তখন গোকুলের বয়েস ছিল সাতাশ বছর। একটা চব্বিশ বছরের মেয়ের মধ্যে নীলাকে খুঁজলে কি পাওয়া যায় নীলাকে? কিন্তু গোকুলের মন নীলার বয়েস বাড়াতে চায় নি। প্রতিদিন প্রতিটা চব্বিশ বছরের মেয়ের মধ্যে সে নীলাকেই খুঁজে পায়। সাতান্ন বছরের গোকুল ভাবে নীলার জীবনে গোধূলি যেন আরও অনেক অনেক পরে আসে। দিনের আলোটা যেন আরও অনেকক্ষণ ধরে থাকে। 

 

(ডাঃ) অরুণ চট্টোপাধ্যায়  মোবাইল ৮০১৭৪১৩০২৮ মেলঃ chattopadhyayarun@gmail.com ফেবুঃ chattopadhyayarun@facebook.com



 

কাবেরী তালুকদার


 



পৃথা

কাবেরী তালুকদার

 

ধাত্রেয়ীকা এই নিয়ে চার বার জিজ্ঞাসা করলেন পৃথাকে ,কে এই তস্কর, তোমার সরলতার সুযোগ নিয়ে তোমাকে এমন কলঙ্কিনী করে চলে গেলো?মধ্যরাত্রি।আনমোনা পৃথা এবার শুনতে পেলো।প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলো ,তস্কর তিনি নন ধাত্রেয়ীকা। আমার আরাধ্য দেবতা। প্রতিদিন ভোরে তাঁকে অর্ঘ্য দিয়ে আমার দিন শুরু হয়।তিনি পৃথিবীর আলোক রাজ সূর্য। তিনিই আমার এই অনাগত সন্তানের পিতা।,চমকে উঠলেন ধাত্রেয়ীকা।কি বলছো তুমি পৃথা? তিনি তোমার সঙ্গে এমন করলেন কেন? তুমি কি সুযোগ দিয়েছিলে?পৃথা এবার ধিরে ধিরে বললো,ঋষি দুর্বাসা আমার আপ্যায়নে খুশী হয়ে বর প্রদান করেছিলেন। আমি রাজরানী হবো আর মন যাকে চাইবে তাকেই পাবো। সেদিন ভোরে অর্ঘ্য দিতে গিয়ে মনে মনে তাঁকে দর্শনের কামনা করেছিলাম। তিনি এসে আমাকে দর্শন দিয়ে ছিলেন। আমি অবাক হয়ে তাঁর রূপ দেখছিলাম জগৎ সংসার সব ভুলে। তিনি জানতে চেয়েছিলেন আমি কে?কেন তাঁকে ডেকেছি।এবার আমার হুঁস ফিরেছিলো। বললাম, আমি রাজা কুন্তীভোজে র পালিতা কন্যা কুন্তী।আর শুধুই দেখতে ইচ্ছা হয়েছিলো ,তাই সেই আহ্বানটুকুই করে ছিলাম। কিন্তু আমার আপনাকে দেখা হয়ে গেছে আলোকরাজ ভাস্কর।এবার আপনি চলে চলে যান।অল্প হেসে সূর্য বলেছিলেন ,আমাকে দেখার ইচ্ছে কেন হলো পৃথা?,জানিনা তো পৃথা উত্তর দেয়। সূর্য এবার হেসে উঠে বলেছিলেনতুমি তোমার ইচ্ছার অর্থ জানো না, শুধু মাত্র ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে আমাকে আহ্বান করে তোমার সম্মুখে নামিয়ে এনেছো।দেখো আজ আর আমার উদয় ঘটেনি।তাই পৃথিবী মেঘাচ্ছন্ন।তোমার এই ইচ্ছার নাম কামনা। তুমি আমাকে কামনা করেছো।সেই উদ্দেশ্য তো সফল না করে আমি যেতে পারি না।, ধাত্রেয়ীকা, অত রূপের সামনে আমি অবশ হয়ে জাচ্ছিলাম। লজ্জায় কন্ঠ রোধ হয়ে গিয়েছিলো। আমি সূর্য কে ভালোবেসে ফেললাম।অবরুদ্ধ লজ্জায় নিজেকে সঁপে দিলাম তাঁর প্রশস্ত বক্ষে।মৃদু হেসে আমাকে গ্রহন করলেন।যাবার আগে বলে গেলেন ,এখন থেকে তুমি আমি আর এক অনাগত প্রান এক সূত্রে আবদ্ধ হলাম।আর বললেন যে পুত্র জন্মাবে , সে বীর্য্যবান বীর শ্রেষ্ঠ,রূপবান চরিত্রবান, অনেক গুনের অধিকারী।জন্মলগ্নে আমি তাকে আশীর্বাদ করবো।,,ধাত্রেয়ীকা বললেন কিন্তু লোক সমাজ তো তোমার কথা বিশ্বাস করবে না, মানবেও না।কি করবে তুমি এই পুত্রকে।পৃথা বললো জলে ভাসিয়ে দেবো।তাহলে তো কেউ কিছু জানবে না।ধাত্রেয়ীকা বলেন ,সেও কি এত ই সহজ পৃথা।,,যথাকালে মধ্যরাত্রে পৃথা জন্ম দেয় এক অনন্য সুন্দর পুত্রের।সহজাত কবচ ও কুন্ডল নিয়ে সে জন্মেছে।ধাত্রেয়ীকা তাড়া দেয়,চলো পৃথা ,রাত শেষ হবার আগেই একে ভাসিয়ে দিতে হবে।,পৃথা কেঁদে ওঠে ।বলে ,ধাত্রেয়ীকা পুত্রকে শুধু একটি দিনের জন্যে তার মাতার কাছে থাকতে দাও।,চোখের জল মুছে ধাত্রেয়ীকা কঠিন স্বরে বলে ওঠেন ,না,। আমি পেটিকা নিয়ে নদীতে যাচ্ছি। তুমি যতশীঘ্র পার পুত্র নিয়ে এসো।,নদীতে প্রচুর পদ্ম ফুটে আছে।পৃথা অপলকে পুত্রের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে , কোনো গৃহে শিশুর চঞ্চল পায়ের নূপুর বাজবে ,সে গৃহ কিন্তু আমার গৃহ নয় ধাত্রেয়ীকা।কোনো কিশোর মাতৃসম্মোধনে তার মাতাকে ডাকবে,। সে মাতা আমি নই।কোন যুবক রাজবেশ পরে সন্ধ্যা লগ্নে চন্দ্রমা সম নব বধূ নিয়ে আঙিনায় এসে দাঁড়াবে।মাতা মঙ্গল শঙ্খ বাজিয়ে পুত্র পুত্রবধূকে আশীর্বাদ করবেন ।সে মাতা কিন্তু আমি নই ধাত্রেয়ীকা। আমি শুধুই কলঙ্কিনী কুন্তী। ধাত্রেয়ীকা পেটিতে শিশু কে শুইয়ে রজ্জু খুলে দেয়। ধীর তরঙ্গে পেটিকা ভেসে যায় হস্তিনাপুরের দিকে।

     সমাপ্ত