
অনুভব
রূপালী মুখোপাধ্যায়
আজকাল প্রায়দিনই নানা অজুহাত দেখিয়ে কামাই করছে নমিতা , আমি আর পারছি না । কামাই যেন নমিতার নিত্য রুটিন হয়ে যাচ্ছে ।
এইসব ভাবতে ভাবতে রুমি স্নান করতে গেল । কাজ করতে করতে আজ স্নান করতেও দেরী হয়ে গেল । তাড়াতাড়ি স্নান সেরে ব্যালকনিতে ভিজে শাড়ি মেলতে গিয়ে দেখলো একটি বয়স্ক লোক ঘাড়ে করে একটি লোহার মেশিন নিয়ে হেঁটে চলেছে আর অস্ফুট স্বরে কিছু একটা বলছেন । দেখে বোঝা গেল ছুরি কাঁচি ধার করেন । হটাৎ রুমিদের পাশে তিনতলা বাড়ি থেকে ডাক পড়লো । ভদ্র লোক আবার পিছিয়ে এসে উপর দিকে তাকালেন । উপর থেকে শোনা গেল জয়ার মায়ের গলা । এই কাঁচি টা ধার করতে কত লাগবে ? উনি বললেন মা ষাইট টাকা দিবেন । নানা অত পারবো না , তিরিশ টাকায় হবে ? না মা পারবো নি । তবে করে দাও, আর পাঁচ টাকা বেশী দেবো । না মাইজী পারবো নি , বলে ভদ্র লোকটি আবার হাঁটতে শুরু করলেন ।
রুমির ভদ্র লোকটিকে দেখে কষ্ট হলো , ভাবলো ডাকি , এমনি এমনি তো ডাকা যায় না । একটি ছুরি সান দেওয়ার নাম করে ডাকলো ।
লোকটি বললেন দ্যান মা কি ধার করতি হবে ।
লোকটির কথা বলার ক্ষমতা নেই , হাঁপাচ্ছেন ।
বলেন দেখ মা কাজ পাই নে , খুব কমজন ডাকেন । তাও আবার অত কম দিলে করি ক্যামনে কন । আমাদের তো খেতি হবে বলেন মা । আপনি একটু জল খাবেন ? তা দিলে একটু খাই । ঠিক আছে এই ছায়াটায় বসুন আমি জল আনছি । রুমি একটি থালায় দুটো রুটি আর একটু তরকারি দিয়ে বলে ,খান তারপর আমার এই ছুরিটা ধার দিয়ে দেবেন । মিস্ত্রি মশাই একটু কিন্তু কিন্তু করলো তারপর খেয়ে নিলো ।
আপনি থাকেন কোথা ? রুমি জিগ্যেস করলো । বললেন এই শিব মন্দিরে গো এম এম সিতে , ওখানেই লেবারের কাজ করতাম । ওটা তো বন্ধ হয়ে গেল তারপর থেকে এই কাজই করি মাইজী । আর পারি না এই ভারী মেশিন নিয়ে গোটা এলাকায় হাঁটা আবার পা দিয়েই মেশিন টা চালাতে হয়। খুব কষ্ট হয় গো মাইজী । দ্যান ছুরিটা দ্যান , ধার করে দিই ।
আচ্ছা আপনি তো একজায়গায় বসে কাজটা করতে পারেন ? সে রকম জায়গা পাইনি গো মাইজী । আপনি যদি আমাদের এই কালি তলার একপাশে বসেন ? সেকি বসতি দিবে গো মাইজী ? ঠিক আছে আমি কথা বলবো । আপনি সামনে সপ্তাহে একবার আসবেন । রুমি সমাজ কল্যাণ দপ্তরে কাজের সূত্রে কাউন্সিলরের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ ছিলো । কাউন্সিলর কে বলে একটি ছোট্ট চালা বানিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিলো রুমি ।
তারপরের সপ্তাহ থেকে মিস্ত্রি মশাই ওখানে বসেই কাজ করেন , প্রথমে ভালো কাজ পায় নি তারপর থেকে মোটামুটি চলে , তাতে ওদের দুজনের চলে যায় । ছেলে বৌ আলাদা থাকে , ওদের দেখে না । খোঁজও রাখে না । তার জন্য মিস্ত্রি মশাই এর কোন রাগ দুঃখ নেই । ওর মায়ের একটু দুঃখ আছে । ছেলে একটা কারখানায় কাজ করে । রুমীর ব্যবহারে জন্য রুমিকে ভদ্রলোক খুব শ্রদ্ধা করে , ভালোও বাসেন । নিজের মেয়ের মতো মনে হয় বলেন আমার তো কিছু দেওয়ার নেই , কি দিব মা আপনাকে ?
রুমি বলে দেওয়ার নেই বললে তো চলবে না । দিতে তো হবেই আপনাকে। কি দিব মা আমি ?
থাকলে নিচ্ছই দিতুম । আপনি আমার জন্য এতো করলে আমি কিছু দিতুম না ? বিশ্বেস করেন মা আমার কিছুই নেই । রুমি বলে কেন আপনার কাছে আশীর্বাদ নেই ? ওটাই আমার চাই । দিতেই হবে আপনাকে । তখন মিস্ত্রি মশাই হেসেই খুন । অনেক অনেক আশীর্বাদ করি মা , আপনে সুখী হন , ভালো থাকেন , সুস্থ থাকেন ।
আমার আশীর্বাদে কাজ না হলে আল্লা করবেন মা , আল্লা করবেন ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন