
বিষণ্ণ বিকালে
-ডাঃ অরুণ চট্টোপাধ্যায়
তিনদিন আগে শেষ বাঁধনটাও চলে গেল। গোকুলের মা সকলের মায়া কাটিয়ে চলে গেল। রেখে গেল একটা বিরাট শূন্যতা।
সে প্রতিবাদী নয় তাই হিন্দু নিয়ম অনুসারে কাছা গলায় করেছে। নিয়ম অনুসারে দিনে একবার স্বপাক খায়। সে যে বিরাট ধার্মিক তাও নয়। তবে সর্বদা যেন কে তাকে বলে যাচ্ছে মাকে তুমি অবহেলা করছ না তো?
মা নেই এটা বিশ্বাস যেন এখন সে করতে পারে না। যেন মনে হয় নিয়ম পালনে অবহেলা মাকে অবহেলার সামিল। মনের মধ্যে একটা কাঁটা শুধু খচখচ করতে থাকে।
আজ সারা দুপুর বৃষ্টি হয়েছে। তুমুল বৃষ্টি। বিকেলের দিকটায় ধরেছে। আকাশ এখনও তেমন পরিষ্কার নয়। পশ্চিম আকাশে মেঘটা ছিঁড়ে ফালা করে সূর্যটা মুখ বাড়িয়েছে। দুর্বল রোদের আলো মেঘে মেঘে প্রতিফলিত হয়ে ছিটকে আসছে।
মা তো ভুগছিল সেই কবে থেকে। তার যখন সতের বছর বয়েস তখন বাবা হঠাৎ মারা যাবার পর থেকেই মা শয্যা নিয়েছে। ভাগ্যি বাবার ফ্যামিলি পেনশনটা ছিল তাই পড়াশোনাটা কোনমতে চলেছে।
কলেজে প্রেম করা হয়ে ওঠে নি। সে সাংঘাতিক ভাবে এড়িয়ে এড়িয়ে গেছে। তাই কেউ তার সঙ্গে মিশত না। কেউ নোট দিয়ে বা বই দিয়ে সাহায্য করত না। কেনার সাধ্য ছিল না গোকুলের। সরকারী চাকরি হলেও বাবার চাকরিটা তো বিরাট কিছু ছিল না যে ফ্যামিলি পেনশন একটা বিরাট মাপের হবে।
কলেজ আর বাড়ি এই ছিল তার জীবন। অসুস্থ মা তো কিছুই করতে পারে না। এক টুকরো মাছ যার কাছে বিরাট বিলাসিতা তার পক্ষে প্রেমিকা নিয়ে রেস্টুরেন্টে ঢোকা অসম্ভব। তবু প্রেম তো যৌবনের দরজায় উঁকি পাড়বেই। মানুষ তো কোনও ইঁট পাথর দিয়ে গড়া নয়। একুশ বছরে নীলা এসেছিল। দরিদ্র মেয়েটি অনেক করে বলেছিল, চিন্তা কিসের আমরা আধপেটা খেয়ে থাকব। আমি মায়ের দেখাশোনা করব আর তুমি একটা চাকরি বাকরির চেষ্টা করবে।
নীলাকে সত্যি ভালবেসেছিল গোকুল। এই প্রচন্ড দারিদ্রের দরিয়ায় নিজের সঙ্গে তাকেও ভাসিয়ে দিতে মন চায় নি। চাকরি খোঁজা দুঃসাধ্য। অসুস্থ মাকে কোথায় রেখে যাবে? এদিকে মায়ের কিছু হলে তো পেনশনটাও আর থাকবে না।
আজ গোধূলিটা এসে পড়েছে অনেক আগে। হয়ত আকাশ আবার মেঘে ঢাকবে। পরে সুযোগ পাবে না বলে আগেই একটা টুকরো ছিটকে এসেছে।
সাতান্ন বছরের গোকুলের চোখে মুখে এখন অস্তগামী সূর্যের আলো।
নিচে কার যেন গলার আওয়াজ। নীলার নাকি? আগ্রহের সঙ্গে ছুটে গেল কার্নিশের দিকে। মুখ বাড়াল রাস্তায়। না নীলা নয়। নীলার মতই অসংখ্য নীলা চলেছে তাদের বর বাচ্চা নিয়ে।
নীলার বাবা অবশ্য অপেক্ষা করে নি। এক শিক্ষকের সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। তখন গোকুলের বয়েস ছিল সাতাশ বছর। একটা চব্বিশ বছরের মেয়ের মধ্যে নীলাকে খুঁজলে কি পাওয়া যায় নীলাকে? কিন্তু গোকুলের মন নীলার বয়েস বাড়াতে চায় নি। প্রতিদিন প্রতিটা চব্বিশ বছরের মেয়ের মধ্যে সে নীলাকেই খুঁজে পায়। সাতান্ন বছরের গোকুল ভাবে নীলার জীবনে গোধূলি যেন আরও অনেক অনেক পরে আসে। দিনের আলোটা যেন আরও অনেকক্ষণ ধরে থাকে।
(ডাঃ) অরুণ চট্টোপাধ্যায় মোবাইল ৮০১৭৪১৩০২৮ মেলঃ chattopadhyayarun@gmail.com ফেবুঃ chattopadhyayarun@facebook.com
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন