পৃথা
কাবেরী তালুকদার
ধাত্রেয়ীকা এই নিয়ে চার বার জিজ্ঞাসা করলেন পৃথাকে ,কে এই তস্কর, তোমার সরলতার সুযোগ নিয়ে তোমাকে এমন কলঙ্কিনী করে চলে গেলো?মধ্যরাত্রি।আনমোনা পৃথা এবার শুনতে পেলো।প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলো ,তস্কর তিনি নন ধাত্রেয়ীকা। আমার আরাধ্য দেবতা। প্রতিদিন ভোরে তাঁকে অর্ঘ্য দিয়ে আমার দিন শুরু হয়।তিনি পৃথিবীর আলোক রাজ সূর্য। তিনিই আমার এই অনাগত সন্তানের পিতা।,চমকে উঠলেন ধাত্রেয়ীকা।কি বলছো তুমি পৃথা? তিনি তোমার সঙ্গে এমন করলেন কেন? তুমি কি সুযোগ দিয়েছিলে?পৃথা এবার ধিরে ধিরে বললো,ঋষি দুর্বাসা আমার আপ্যায়নে খুশী হয়ে বর প্রদান করেছিলেন। আমি রাজরানী হবো আর মন যাকে চাইবে তাকেই পাবো। সেদিন ভোরে অর্ঘ্য দিতে গিয়ে মনে মনে তাঁকে দর্শনের কামনা করেছিলাম। তিনি এসে আমাকে দর্শন দিয়ে ছিলেন। আমি অবাক হয়ে তাঁর রূপ দেখছিলাম জগৎ সংসার সব ভুলে। তিনি জানতে চেয়েছিলেন আমি কে?কেন তাঁকে ডেকেছি।এবার আমার হুঁস ফিরেছিলো। বললাম, আমি রাজা কুন্তীভোজে র পালিতা কন্যা কুন্তী।আর শুধুই দেখতে ইচ্ছা হয়েছিলো ,তাই সেই আহ্বানটুকুই করে ছিলাম। কিন্তু আমার আপনাকে দেখা হয়ে গেছে আলোকরাজ ভাস্কর।এবার আপনি চলে চলে যান।অল্প হেসে সূর্য বলেছিলেন ,আমাকে দেখার ইচ্ছে কেন হলো পৃথা?,জানিনা তো পৃথা উত্তর দেয়। সূর্য এবার হেসে উঠে বলেছিলেনতুমি তোমার ইচ্ছার অর্থ জানো না, শুধু মাত্র ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে আমাকে আহ্বান করে তোমার সম্মুখে নামিয়ে এনেছো।দেখো আজ আর আমার উদয় ঘটেনি।তাই পৃথিবী মেঘাচ্ছন্ন।তোমার এই ইচ্ছার নাম কামনা। তুমি আমাকে কামনা করেছো।সেই উদ্দেশ্য তো সফল না করে আমি যেতে পারি না।, ধাত্রেয়ীকা, অত রূপের সামনে আমি অবশ হয়ে জাচ্ছিলাম। লজ্জায় কন্ঠ রোধ হয়ে গিয়েছিলো। আমি সূর্য কে ভালোবেসে ফেললাম।অবরুদ্ধ লজ্জায় নিজেকে সঁপে দিলাম তাঁর প্রশস্ত বক্ষে।মৃদু হেসে আমাকে গ্রহন করলেন।যাবার আগে বলে গেলেন ,এখন থেকে তুমি আমি আর এক অনাগত প্রান এক সূত্রে আবদ্ধ হলাম।আর বললেন যে পুত্র জন্মাবে , সে বীর্য্যবান বীর শ্রেষ্ঠ,রূপবান চরিত্রবান, অনেক গুনের অধিকারী।জন্মলগ্নে আমি তাকে আশীর্বাদ করবো।,,ধাত্রেয়ীকা বললেন কিন্তু লোক সমাজ তো তোমার কথা বিশ্বাস করবে না, মানবেও না।কি করবে তুমি এই পুত্রকে।পৃথা বললো জলে ভাসিয়ে দেবো।তাহলে তো কেউ কিছু জানবে না।ধাত্রেয়ীকা বলেন ,সেও কি এত ই সহজ পৃথা।,,যথাকালে মধ্যরাত্রে পৃথা জন্ম দেয় এক অনন্য সুন্দর পুত্রের।সহজাত কবচ ও কুন্ডল নিয়ে সে জন্মেছে।ধাত্রেয়ীকা তাড়া দেয়,চলো পৃথা ,রাত শেষ হবার আগেই একে ভাসিয়ে দিতে হবে।,পৃথা কেঁদে ওঠে ।বলে ,ধাত্রেয়ীকা পুত্রকে শুধু একটি দিনের জন্যে তার মাতার কাছে থাকতে দাও।,চোখের জল মুছে ধাত্রেয়ীকা কঠিন স্বরে বলে ওঠেন ,না,। আমি পেটিকা নিয়ে নদীতে যাচ্ছি। তুমি যতশীঘ্র পার পুত্র নিয়ে এসো।,নদীতে প্রচুর পদ্ম ফুটে আছে।পৃথা অপলকে পুত্রের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে , কোনো গৃহে শিশুর চঞ্চল পায়ের নূপুর বাজবে ,সে গৃহ কিন্তু আমার গৃহ নয় ধাত্রেয়ীকা।কোনো কিশোর মাতৃসম্মোধনে তার মাতাকে ডাকবে,। সে মাতা আমি নই।কোন যুবক রাজবেশ পরে সন্ধ্যা লগ্নে চন্দ্রমা সম নব বধূ নিয়ে আঙিনায় এসে দাঁড়াবে।মাতা মঙ্গল শঙ্খ বাজিয়ে পুত্র পুত্রবধূকে আশীর্বাদ করবেন ।সে মাতা কিন্তু আমি নই ধাত্রেয়ীকা। আমি শুধুই কলঙ্কিনী কুন্তী। ধাত্রেয়ীকা পেটিতে শিশু কে শুইয়ে রজ্জু খুলে দেয়। ধীর তরঙ্গে পেটিকা ভেসে যায় হস্তিনাপুরের দিকে।
সমাপ্ত

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন