শরশয্যায়
বহ্নিশিখা
ধপাস !
হাত থেকে পড়ে গেলো গলাভর্তি জলের গ্লাস।ঠোঁটের কাছে নিতেই।
প্রিয় অনেক হাতের স্পর্শমাখা কাঁসার গ্লাস।ভাঙেনি।মাটির ঘর বলে। তাই উঠানোর চেষ্টা করলো না।
গড়িয়ে যাওয়া জলের দিকে তাকিয়ে থাকে আনিসুজ্জামান। অবাধ্য এই গভীর রাতটাতে খুব তেষ্টা পায়। মনে হয় ভূ-গর্ভের সমস্ত জল খেয়ে ফেলে একচুমুকে। তোলপাড় করা অবাধ্য রাত জেগে উঠে মনের ভেতর।
সেদিন স্বেচ্ছায় এককাপড়ে চলে এসেছিল সে। চালচুলোহীন প্রেমিকের হাত ধরে।তারপর কাজী অফিস। অনৈতিক ঝঞ্ঝাগুলো অতিক্রম করে--ছোট্ট একরুমের ভাড়া ঘরে সংসার শুরু করে আনিস।
নাজমা স্বচ্ছল পরিবারের মেয়ে। মুদি ব্যবসায়ী আব্দুস সালামের একমাত্র মেয়ে।
মেয়ের স্কুলে যাবার সুবিধার জন্য রিকশা কিনে ছিলেন তিনি। বাড়ি থেকে স্কুল তিন কিলোমিটার। সে সুবাদে পাশের গ্রামের কলেজ পড়ুয়া আনিসুজ্জামানকে ভাড়া দেয়।
স্কুলের সময় মত আনিস নাজমাকে নিয়ে যায়, আবার ফেরত নিয়ে আসে ছুটির পর।
এক রোড এক্সিডেন্টে আনিসের বাবা-মা দুজনই কিছুদিন চিকিৎসার পর মারা যায়।
চিকিৎসার জন্য ফসলি জমিগুলো বিক্রি হয়ে যায় অল্প দামে। থেমে গিয়েছিল আনিসের পড়াশুনা।
পরিশ্রমি দুটো তেজীয়ান ঘোড়ার মতো পথ চলতে চলতে পরিবর্তন আসে সংসারে।
ভাড়া রিকশা থেকে অটো, সি এন জির মালিক হয় আনিস। সংসারে আসে নতুন মুখ।
নাজমার বাবা আগে না মানলেও এবার নাতির টানে মেনে নিয়েছে মেয়েজামাইকে।
দিনে একবার না দেখলে রীতিমতো অসুস্থবোধ করে। সে সুবাদে মেয়ের পছন্দের কিছু বাজার দিয়ে আসে।
আনিস যখন ঘরে ফিরে তখন নীরব নিস্তব্ধ রাত। নাজমা টেবিলে খাবার রেখে ছেলেকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। যেদিন দূরে কোথাও ভাড়া নিয়ে যায় বাসায় ফিরে না,আগেই জানিয়ে রাখে। এভাবেই গত হয় পাঁচবছর।
ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে।নাজমা ছেলেকে সাথে নিয়ে কাটিয়ে দেয়।হঠাৎ দুর্যোগ নেমে আসে।কাজে গিয়েও আনিস ফিরে আসে। বুকে ব্যথা নিয়ে। সেদিনই স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তি হয়। বাম সাইড পুরো অবশ।
কিছুদিন হাসপাতালে থাকার পর ওষুধ লিখে রিলিজ করে দেয়।অনেকেই দেখতে আসে। আহা উহু করে চলে যায়। বেশ কিছুদিন কাজ না করায় ফুরিয়ে আসে আনিসের জমানো টাকা।
বন্ধু আবির প্রায়ই তাকে দেখতে আসে। সব সময়ই কিছু না কিছু নিয়ে আসে। এখন আর তাকে ভাল লাগে না আনিসের। যদিও তার কাছে বেশিক্ষণ বসে না। অনেক সময় তার সাথে দেখাও করে না। নাজমার সাথে তার হাসাহাসিটাই তার উপস্থিতি জানান দেয়। আনিসের ইচ্ছে করে দুটোকে কুপিয়ে খুন করে ফেলে।
যখন আবির আসে দশ বছরের ছেলেটা তার বাবার কাছে বসে থাকে। আবির আংকেলকে তার ভালো লাগে না।যেদিন তার মা আবির আংকেলের সাথে চলে যায় সেদিন সে বায়না ধরেছিল তার মার সাথে যাবে বলে। তার মা বলেছিল তোমার জন্য জামা কিনতে যাই বাপ। তুমি তোমার আব্বার কাছে থ্যাইক্কো ।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন