ক্ষণিকের সাজ
রূপা বাড়ৈ
সারাদিনের প্রচণ্ড গরমে শরীর থেকে প্রচুর ঘাম ঝরে যাওয়ায় খুব ক্লান্ত লাগছে, তাই দুপুরে খাওয়ার পরে ফ্রিজ থেকে চারটা বরফজমা স্প্রাইট এর বোতল বের করে একটা বালতির মধ্যে করে এনে সিলিংফ্যানের নিচে রেখে বিছানায় শুয়ে পরলাম, ঘরটা একটু ঠাণ্ডা অনুভব হওয়াতেই প্রশান্তির ঘুম এসে গেলো। কতোটুকু সময় ঘুমিয়েছিলাম বলতে পারবো না, এরই মধ্যে স্বর্ণা এসে জোরছে একটা ঠেলা দিয়ে বললো স্বপ্না তাড়াতাড়ি উঠে পড় আর চল মাঠে যাই বিশাল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে ২৬ শে মার্চ- স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কাউন্সিলর আসবেন, মেয়র আসবেন আরো অনেক গুণীজন আসবেন। লাল- সবুজ শাড়ী পরে তারাতাড়ি রেডি হয়ে নে। ঘুমন্ত কর্ণে এইটুকু শুনেই তাড়াহুড়ো করে হন্তদন্ত হয়ে উঠে শুনতে পাচ্ছি মন মাতানো প্রিয় দেশাত্মবোধক গান মাইকে বাজছে। আজ যে অনুষ্ঠান সে তো জানতাম কিন্তু একেবারে ভুলে গিয়েছিলাম। স্বর্ণা লাল-সবুজ শাড়ীর সাথে মিল করে পরেছে হাত ভরে লাল-সবুজ রেশমী কাচের চুড়ি, লাল টিপ, সব রকম মেকাপে সেজেগুজে একেবারে রেডি হয়ে এসেছে। খুব সুন্দর দেখতে লাগছে ওকে, এর আগে কখনো এমন সুন্দর সাজে স্বর্ণাকে দেখি নাই তাই হাঁ করে তাকিয়ে আছি স্বর্ণার মুখের দিকে। এমন সময় হাত টেনে উঠিয়ে বসিয়ে দিলো স্বর্ণা আমায়। মুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে আসার সাথে সাথেই স্বর্ণা সাজাতে শুরু করলো, ওর মতো করেই সাজিয়ে ড্রেসিংটেবিলের আয়নার সামনে নিয়ে বললো এবার নিজেকে দেখ চোখ ফেরাতে পারবি না। সত্যিই বলেছে স্বর্ণা, আমি আয়নায় আমাকে দেখে নিজেই নিজেকে চিনতে পারছি না, আমি যে এতো সুন্দর দেখতে তা কখনো জানতে পারিনি, কারণ আমি কখনো এতো সুন্দর করে আগে সাজি নাই, এই প্রথম এতো সেজেছি। এবার দুজনে একসাথে বেরিয়েছি অনুষ্ঠানে যাবার জন্য, পথে যেতে যেতে দেখছি সবাই লাল-সবুজ পোষাকে সজ্জিত হয়ে যাচ্ছে অনুষ্ঠানের মাঠে। এমন দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে যেন নীল আকাশের নিচে বিশাল এক লাল-সবুজ স্বাধীন পতাকা পতপত করে উড়ছে। আমি মুগ্ধ হয়ে চেয়ে আছি সেই মানব পতাকার দিকে, হঠাৎ মনে হলো একটা সেলফি তুলি স্মৃতি করে রাখতে, সাইডব্যাগ হাতিয়ে কোথাও মোবাইলটা না পেয়ে বুঝতে বাকি রইলো না মোবাইল ঘরে ফেলে রেখে এসেছি। স্বর্ণাকে সেলফির কথা বলতেই ওর মোবাইল বের করে কয়েকটা সেলফি তুলে এগিয়ে যাচ্ছি অনুষ্ঠানের দিকে, কিন্তু শত সহস্র মানুষের ভিড় ঠেলে যাওয়া হলো না সামনের দিকে, তাই অপারগ হয়ে পিছনে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠানের কিছু অংশ উপভোগ করছি আর মাঝে মাঝে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে মনের তৃপ্তি নিয়ে সকলের সাজসজ্জা দেখছি। হঠাৎ দেখি কালো মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ, মুহুর্তেই ধূলো উড়ানো বাতাস এসে ধূলোতে ঢেকে দিলো সমস্ত অনুষ্ঠান, লণ্ডভণ্ড এক হিংস্র থাবায় পণ্ড করে দিলো সব সাজ। আঁধার নামিয়ে ঝড়ো বৃষ্টি ঝরিয়ে সকল মানুষকে করলো হয়রান। আমি স্বর্ণাকে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে ফেলে মনে কষ্ট নিয়ে একা একা ঘরে ফিরে এসে ভেজা কাপড় পাল্টিয়ে এককাপ গরম কফি হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ভাবছি- কেন এমন হয়, কেন সব সৌন্দর্য এক সময় নষ্ট হয়ে যায়।তবে কেন করি বড়াই, কেন করি এতো সাজ, সব কিছুই তো মিছে, সব কিছুই তো ক্ষণিকের অনুভব।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন