তমা কর্মকার
আজ আকাশের মনে খুব খুশি | আজ যে তারার সাথে দেখা হবে | দুবছর হল তারার সাথে দেখা হয়নি | তারার সাথে দেখা করার জন্য গাড়িতে ওঠে আকাশ | আর গাড়িতে যেতে যেতে ভাবে পেছনে ফেলে আসা দু বছরের আগের কথা | আকাশ স্বচ্ছল পরিবারের একমাত্র ছেলে | বাবা মায়ের নয়নের মনি | আর তারা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে, তারার সাথে আকাশের পরিচয় বাসে|সে দিন গাড়িটা গ্যারেজে থাকায় আকাশ বাসে করেই অফিস যাচ্ছিলো আর তারা রোজ ওই বাসে করেই কলেজ যায় | প্রথম দেখাতে তারাকে খুব ভালো লাগে আকাশের | তাই নিজে থেকেই আলাপ করে আকাশ | তারাও আকাশকে খুব পছন্দ হয় | ওদের পরিচয়টা একটা সময় রূপ নেয় ভালোবাসায় | আকাশ বাড়িতে তারার কথা জানায় | কিন্তু বাড়ীর কেউ রাজী হয় না ওদের বিয়ে দিতে | এক দিন দুজনে মন্দিরে গিয়ে বিয়েটা সেরে ফেলে চুপি চুপি| দুজন ছাড়া দুই পরিবারের কেউ জানে না ওদের বিয়ের কথা| আকাশ বিদেশী ভালো কোম্পানিতে উঁচু পোস্টে চাকরী কর | ওদের কোম্পানির নিয়ম প্রত্যেক বছর এক জনকে প্রমোশনের জন্য ট্রেনিং করতে বিদেশ যেতে হবে | এবার আকাশের পালা| সেই মত আকাশের বিদেশ যাওয়া |
ড্রাইভারের ডাকে চমকে উঠে আকাশ, দেখে তারাদের বাড়ীর সামনে এসে তার গাড়ীটা দাঁড়িয়েছে | আকাশ গাড়ী থেকে নেমে তারাদের বাড়ীর ভিতরে যায় | ও তারার খোঁজ করে | ওই বাড়ী থেকে জানানো হয়, আমরা এই বাড়িটা নতুন কিনেছি | আগে যাদের বাড়ী ছিল তেনারা বাড়ী বিক্রি করে কোথায় চলে গেছে, তা আমরা জানি না--
আকাশ কি আর করে--ফিরে আসে বাড়িতে আর চারিদিকে তারার খোঁজ করতে থাকে | আকাশ বিদেশী কোম্পানির চাকরীটাও ছেড়ে দেয় | মধুপুর গ্রামের স্কুলের হেড মাস্টারের চাকরী নিয়ে সেখানেই থাকে | এভাবে কেটে যায় সাত বছর | আকাশের বাড়ী থেকে বিয়ের জন্য বারবার চাপ আসতে লাগে | কিন্তু আকাশ বাড়ীতে পরিষ্কার জানিয়ে দেয় তার বিয়ে হয়ে গেছে তারার সাথে | বাড়ীর লোক কি আর করে, চুপ হয়ে যায় |
একদিন শেষ ক্লাসে অঙ্কের মাস্টার বিমল বাবু ক্লাসে না আসায় আকাশ অঙ্ক ক্লাসটা নেবে বলে ক্লাসে আসে | ক্লাস নিতে নিতে একটা ছোটো মেয়ের দিকে চোখ পড়ে আকাশের | দেখে মেয়েটি নিজের মনে অঙ্ক করতে থাকে | মেয়েটিকে দেখে এক অদ্ভুত মায়া লাগে তার |মনে হয় মেয়েটি যেন তার কত দিনের চেনা| আকাশ ক্লাসের শেষে মেয়েটিকে কাছে ডেকে জানতে চায়--তোমার নাম কি?
মেয়ে বলে, আমার নাম বৃষ্টি |
আকাশ বলে, তোমার বাড়ী কোথায়? বাড়ীতে কে কে আছে ? তোমার বাবার নাম কি?
বৃষ্টি বলে, মধুপুরে | বাবার নাম আকাশ দেবনাথ |আমার বাবা বিদেশ থাকে | আমি মা আর দিদার সাথে থাকি | কথা শেষ করে বাড়ী চলে যায় বৃষ্টি | আকাশ দাঁড়িয়ে ওর বলা কথাগুলি ভাবতে থাকে | কিছুক্ষণ ভাবার পর, কি একটা মনে করে বৃষ্টির পেছন পেছন ওদের বাড়ী যায় | বৃষ্টি যখন ওর মাকে স্কুলের হেড মাস্টারের কথা বলছিল | তখন একটু দূর থেকে আকাশ দেখলো আরে এত তারা | আকাশ তারার সামনে এলো ও ওর নিরুদ্দেশের কারণ জানতে চায় | তারা জানায় আকাশ বিদেশ যাবার পর তারা বুঝতে পারে যে, সে মা হতে চলেছে| তারা বাড়ীতে সব কিছু জানায়| এমন কি আকাশ তারার বিয়ের কথাও | তারার বাবা আকাশের বাবা মাকে সব কিছু জানালেন |সব শুনে আকাশের বাবা মা তারাকে আকাশের বউ হিসাবে মেনে নেওয়া তো দূরের কথা | তারার বাবাকে এত অপমান করেন যে, তারার বাবা হার্ট এটাকে মারা যান| যেহেতু আকাশ তারার বিয়েতে কেউ সাক্ষী নেই সেই হেতু সবাই কুমারী মা হিসাবে তারার বদনাম করতে লাগলো | তাই তারার মা ও তারা বাড়ী ঘর সব কিছু বিক্রি করে এই মধুপুরে চলে আসে| এখানে এসে আকাশ ও তারার ভালোবাসার ফল স্বরূপ বৃষ্টির জন্ম হয় | আকাশ সব শুনে তারাকে জড়িয়ে ধরে | তারাও, আকাশ আমার আকাশ, বলে, আকাশকে জড়িয়ে ধরে | আকাশ তারা ও বৃষ্টিকে নিয়ে গড়ে তোলে তাদের নতুন সংসার |
সমাপ্ত

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন