
গন্ধ রহস্য
অগ্নিশ্বর সরকার
-শিবু কাকা আজ আবারও সেই পচা গন্ধটা পাচ্ছো না? সেই পরশু রাত থেকেই পাওয়া যাচ্ছে গন্ধটা। কাল কি একবার কালী ওঝাকে ডাকবে? বোধ হয় কোনও অপদেবতার নজর পড়েছে আমাদের বাড়িতে।
খাওয়া শেষ করে দাওয়ায় বসে অনুপম তার ছোটকাকা শিবুর সাথে আলোচনায় মগ্ন। বর্ধমানের ইদিলপুরের এক স্বচ্ছল চাষি পরিবারের সদস্যরা আজ চিন্তিত। অনুপম সাহা বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে পাশ করে পারিবারিক জমির চাষবাসের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছে। সাথে বাড়ি লাগোয়া একটা জমিতে দেওয়া সার-কীটনাশকের দোকান খুলেছে। পারিবারিক জমিতে চাষবাস করা ছাড়াও বাড়ির পিছনের বাগানের এক অংশ পরিষ্কার করে নিজের উদ্যোগে কিছু সব্জি চাষও করেছে। খুব সুখী পরিবার। কিন্তু গত দু-দিন ধরে এই মড়া-পচা গন্ধটা সেই সুখের সংসারে একটা অস্থির পরিবেশ তৈরি করেছে। ওদিকে ছোট ভাইয়ের বউ দশ-মাসের প্রেগন্যান্ট। চিন্তা তাকে নিয়ে সবথেকে বেশি। যদিও একবিংশ শতাব্দীতে এইসব কুসংস্কারের কোনও জায়গা নেই, তবুও এই গ্রাম্য পরিবেশে আজ অনুপমও এইসবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।
- অনুপম কালই আমি কালীর বাড়িতে যাচ্ছি। আমি বললেই আসবে।
- কাকা, আমি তো কাল সারাদিন পূর্ব-পাড়ার জমিতে আলু তোলা নিয়ে ব্যস্ত থাকবো, তুমিই বাড়িতে থেকো।
- তাই হবে খন।
কথায় কথায় রাত এগিয়ে চলল। রাত গাঢ় হওয়ার সাথে সাথে গন্ধের তীব্রতাও বেড়ে চলল।
পরেরদিন দুপুরে পাড়ার একটা ছেলে ছুটতে ছুটতে অনুপমের কাছে গেল।
- দাদা শিগগিরি বাড়ি যাও। তোমাদের বাড়ির বউ এবার বুঝি মরে যাবে।
সব কাজ ফেলে রেখে অনুপম বাড়িতে কোনওমতে পৌঁছল। বাড়িতে গ্রামের লোক ভেঙে পড়েছে। কালীওঝা তারস্বরে চিৎকার করছে। ভিড় ঠেলে অনুপম কোনওমতে ছুটল অন্দরমহলে। ছোটবউ অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। বাড়ির মধ্যে একটা চাপা গুঞ্জন, বৌকে ভুতে ধরেছে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সেই মড়া-পচা গন্ধটা। অনুপম কিছুক্ষণ কিংকর্তববিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। প্রকৃতিস্থ হল সনতের ডাকে। সনৎ লক্ষ্মী মাষ্টারের ছেলে, এইবার উচ্চ মাধ্যমিক দেবে।
- অনুকাকু, তুমি ছোট কাকিমাকে নিয়ে এখনই বর্ধমানের হাসপাতালে ভর্তি করো। আর তোমাদের বাড়িতে এতো পচা গন্ধ কিসের? কালীওঝাকে কেন ডেকেছো?
সম্বিত ফিরল অনুপমের। শিক্ষিত হয়ে এটা কী করে করতে পারে সে? এখন এসব ভেবে সময় নষ্ট করার সময় নয়।
- সনৎ, তুই এখুনি হেমেনদের গাড়িটা নিয়ে আয়। বর্ধমান যেতে হবে।
সনৎ তৎক্ষণাৎ ভিড় ঠেলে ত্বরিতগতিতে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শিবুকাকাকে সাথে নিয়ে বাড়ির ছোটবউ আর অনুপমের বাবা-মা রওনা দিল বর্ধমান হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।
সন্ধ্যে থেকে সাহা বাড়িতে আনন্দ দু-গুণ। একটা অবশ্যই বাড়িতে নতুন অতিথির আগমন। হ্যাঁ, বাড়ির ছোটবউ সন্ধ্যের সময় হাসপাতালে ফুটফুটে একটা কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছে। দ্বিতীয়টা অবশ্যই সেই গন্ধের রহস্য সমাধানের জন্য। সনতের বাবা লক্ষ্মী মাস্টার বিজ্ঞানের শিক্ষক। পাড়ার কিছু উৎসাহী ছেলে নিয়ে কালী ওঝাসহ গ্রামবাসীকে অনুপমদের বাড়ি থেকে বিতাড়িত করেন। এরপর অনুপম ও সেই ছেলেগুলি নিয়ে গোটা বাগান খুঁজতে শুরু করেন। উদ্ধার করেন বাগানের এক কোণে থাকা একটা অচেনা বিশাল ফুল। ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখা যায় ওটি আসলে ওলের ফুল। তিনি বলেন,
-আমরা খাবার হিসেবে যে ওল ব্যবহার করি যার বিজ্ঞান সম্মত নাম আমোফফালাস টাইটেনিয়াম, তারই পুষ্পমঞ্জরী এটি। অত্যধিক গরমে বংশবিস্তারের জন্য অনেক সময় ওল গাছে এই ধরণের পুস্পমঞ্জরি দেখা যায়। অনেক সময় মাটি থেকে ওল তুলে নেওয়ার পরও ওলের শিকড়ের অংশ কিছুটা থেকে যায়। যা থেকে পরে ফের মাটির তলায় ওল জন্মায়। এই ভাবে বংশবিস্তারের জন্যই পুষ্পমঞ্জরী তৈরি হয়।
আজ রাতেই অনুপম সিদ্ধান্ত নেয়, কালই দোকানঘরের পাশের ঘরে একটা বিজ্ঞান সচেতনতা ক্লাব খুলতে হবে। গ্রামের মানুষ তবেই তঞ্চকতার হাত থেকে বাঁচবে।
সাধারণের বাইরের একটি ঘটনা নিয়ে লেখা গল্প। গন্ধের উৎস খুঁজে পাবার রহস্য আবিষ্কৃত হল এই সুন্দর গল্পের মাধ্যমে।
উত্তরমুছুন