বীরেন্দ্র মন্ডল
---------------------
১
আমি আর স্বরূপ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিলাম আমাদের দল থেকে। কারণ টা কিছুই নয়, স্বরূপ বেশ মোটাসোটা চেহারার। বয়সও আমার থেকে বেশ বড় - মানে ছয় সাত বছর হবে আর কি। সব দিনই ও দলের পিছনে ধীর গতিতে হাঁটে। বেশ একটা ছন্দ থাকে। ওর ঐ হাঁটার ছন্দ দেখে আমাদের দলের কেউ না কেউ আমাদের মূল হাঁটার দল থেকে আলাদা হয়ে এসে ওর সাথে হাঁটে আর ও হাসি হাসি মুখ করে বেশ একটা প্রশান্তি মুখমন্ডলে ছড়িয়ে দেয়।
আজ ওর প্রিয় সাথী প্রফেসার শঙ্কর দাসচৌধূরী মাঝপথে ঘরে ফিরে যায় কিছু শাক ও কাঁচা আম কিনে ঘরে দিয়ে আসতে । তখন সুযোগ বুঝে আমি ওর জায়গাটা নিয়ে নেই। হাঁটছি ওর সাথে কিছু এটা সেটা কথা বলাবলি করে। হঠাৎ দেখি আমি ওর থেকে বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছি একটা তিনমাথা রাস্তার মোড়ে আমি রাস্তার মাঝখানে গিয়ে থেমে গিয়ে পিছন ফিরে ওর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। একটা গাড়ী সামনে থেকে এসে বাঁদিকে টার্ন নিল। গাড়ীর মহিলা-চালিকা একটা সুন্দর হাসি দিয়ে চলে গেল। উনি তো সুন্দর হাসিটা দিয়ে গেল - তোমার চেনা নাকি? আমি বললাম - না, না - আমি চিনি না।
২
স্বরূপ বলল - তাই কখনো হয় নাকি - না চেনা হলে তোমার দিকে তাকিয়ে অতো সুন্দর করে হাসলো কেন? কথাটা ঠিক ভাবার বিষয়। আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো কেন? আমিও কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়লাম। মহিলার ঐ হাসিতে মনে মনে ভেবে দেখলাম - না, চিনি না। আমি কি ওনাকে কোনো সম্মান দিলাম - আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম আর উনি গাড়ীটা সুন্দর ভাবে ঘুরিয়ে নিয়ে রাস্তাটা পার হয়ে গেলেন। কৃতজ্ঞতা কি জানি। আমরা দু'জন হেঁটে মূল দলে পৌঁছে গেলে স্বরূপ ব্যাপারটা বন্ধুদেরকে বললে তারা প্রথমে খুব একচোট হেসে নিল। হ্যাঁ, ঠিক আছে। নিত্যকারের ব্যাপার, ওসব নিয়ে কার কি দরকার মাথা ঘামানোর।
আমি সেদিন রাতে খাওয়ার পর প্রায় দশটায় শুয়ে পড়লাম। ঘুম ও এসে গেল। ঘুমঘুম চোখে হঠাৎ দেখি কে যেন বলছে - "ওহে তুমি কি এখানে কাউকে দেখেছো? আমি দেখছি তখন আইফেল টাওয়ারের নিচে সবুজ ঘাসের উপরে শুয়ে শেষ আলোর শিখার দিকে চেয়ে আছি। ঘুমের ঘোরে বললাম - কাকে? উত্তর এলো ঐ যে দাঁড়িওয়ালা লোকটা - সবাই যাকে ভিঞ্চি বলে ডাকে।
৩
আমি উত্তর দিলাম - ও এখানে কি করতে আসবে - ও তো ইটালীতে থাকে। তখন ও বলল - আমি মোনা, মোনালিসা। পৃথিবীর সবাই আমাকে চেনে। আমি তখন ধড়ফড় করে উঠে বললাম - ও, তুমি মোনালিসা। পৃথিবী বিখ্যাত তোমার হাসি। ও হ্যাঁ বলল। আমি বললাম - একটা দাঁড়িওয়ালা বুড়ো এসে বিড়বিড় করে মোনা মোনা বলে চলে গেছে অনেকক্ষণ। মোনা বলল - কি অন্যায় বলো তো - আমাকে সৃষ্টি করে কিনা ফ্রান্সের রাজার কাছে বিক্ৰি করে দিল। আর রাজা সেটা লুড্রো মিউজিয়ামে রেখে দিল। সেখান থেকে পেরুগিয়া আমাকে চুরি করে নিয়ে গিয়ে তার বিছানার নীচে দু'বছর লুকিয়ে রাখলো। কারন, সে মোনালিসাকে ভালবেসে বসেছে।
এদিকে তোমরা ভারতীয়রা কিন্তু খুব ভাল। ব্রহ্মা যখন শতরূপাকে সৃষ্টি করলেন - তখন তিনি তার রূপে পাগল হয়ে তাকে বিয়েই করে ফেললেন।
৪
আমি তখন ঘুম-ঘুম চোখে বললাম - তাহলে তুমি হাসো না কাঁদো? ও বলল - আমি বুঝি না। পৃথিবী সারা লোক বলে আমি হাসি। হবে হয়তো। মোনালিসার হাসি।
ঘুমঘোরে আমার হঠাৎ তখন সকালে দেখা মহিলা গাড়ীচালিকার হাসিটার কথা মনে পড়ে গেল। আরে মোনালিসাই তো গাড়ীটা চালাচ্ছিল। আমাকে সুন্দর হাসিটা দিয়ে চলে গেছে। আমি বুঝতে পারিনি। মোনালিসা, তুমি অমনি হাসো কি কাঁদো জানি না। আমরা বলি তুমি হাসো। এই আমাদের সান্ত্বনা । তা না হলে পৃথিবীবাসী আমরা বাঁচবো কি নিয়ে?

বেশ সুন্দর লিখেছেন। ধন্যবাদ।
উত্তরমুছুন