তাপসকিরণ রায়
অরুণা ডুবে যাচ্ছিল। সে দু-তিনবার চিৎকার দিয়েছিল, বাঁচাও, বাঁচাও--তারপর তার দুটো হাত দু’বার জলের ওপর ভেসে উঠতে দেখা গেল। সরলের কানে সে চিৎকার এসে পৌঁছে ছিল। সে দেখছিল, অরুণার শেষ আকুতিপূর্ণ দু’টি হাত জলের উপর ভেসে আছে। এত কিছুর পরও সরল নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিল। সে অরুণার চিৎকার শুনেও শুনতে পেলো না, তার তলিয়ে যাওয়ার আগের দুটো হাত দেখেও দেখতে পেল না। সে তখন উল্টো দিকে মুখ করে আকাশ দেখলো, পাশের ছোট-বড় গাছপালার দিকে তাকিয়ে থাকলো। ও যেন সেই মুহূর্তে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
*********
অরুণা ও সরল ছোট বেলার সাথী ছিল। প্রাইমারি স্কুল থেকে হাই স্কুল পর্যন্ত এক সাথে ওরা পড়াশোনা করেছে। তারপর অরুণা আর পড়াশোনা করতে পারেনি, সরল চলে গেছে কলকাতার এক কলেজে। ছুটিছাটায় ঘরে আসত সরল। অরুণার সঙ্গে দেখা হত। ওরা দুজনে লোকালয়ের বাইরে নির্জনতায় পাশাপাশি বসে প্রেমালাপ করত। অরুণা গেয়ে উঠতো, সখি ভালোবাসা কারে কয়--সে কি শুধুই যাতনাময় ?
সরল বলত, আমি তো তোমার পাশে আছি, সখি, তবু কেন এত বিরহ তোমার অরুণা বলতো ?
অরুণা বলেছিল, তুমি তো আবার চলে যাবে, তোমায় না পেয়ে আমার দিন কাটে কেমন ভাবে বলতো ?
সে দিন সরল যেন প্রগলভ হয়ে উঠেছিল। ও বলেছিল, তাহলে পার্টটাইম কোন প্রেমিক জুটিয়ে নাও--
অরুণা বলেছিল, বাজে বকো না তো তুমি, তুমি বুঝি কলকাতায় প্রেমিকা নিয়ে সময় কাটাও! সেদিন দুজনে মিলে এমনি কথা নিয়ে খুব হেসেছিল।
এই হাসাহাসির বিষয়টা যে একদিন সত্য হয়ে দাঁড়াবে তাকি সরল কোনদিন স্বপ্নেও ভাবতে পেরেছিল!
ছটা মাস সরল বাড়ি আসতে পারেনি। তারপর বাড়ি এসেই শুনতে পেল কথাটা, অরুণা নাকি অন্য প্রেমিকা জুটিয়ে নিয়েছে। কথাটা সরলকে তার বোন জানিয়ে ছিল। বিশ্বাস হয়নি তার, সে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল, মনে মনে ভেবে ছিল, তা হতেই পারে না !
একদিন সত্য সামনে এসে দাঁড়াল। সরলের কদিন পর হঠাৎই অরুণার সঙ্গে সামনাসামনি দেখা হয়ে গেল । ও বলে উঠলো, অরুণা কি ব্যাপার তুমি আমায় এড়িয়ে যাচ্ছো কেন?
অরুণা খানির চুপ থেকে বলে উঠলো, খুব ব্যস্ত আছি সরল।
সরলের রাগ হয়েছিল খুব। সে বলেছিল, ওই গোবিন্দকে নিয়ে ব্যস্ত আছো তো ?
প্রথমটা রাগত চোখে তাকালো অরুণা, এক সময় শান্ত হয়ে বলল, জানো সরল, গোবিন্দকে আমার ভালো লাগে--সে যে আমায় ভীষণ ভালোবাসে--
--আর তুমি? সরল প্রশ্ন করেছিল।
--আমি ? অরুণা একটু ভেবে নিয়ে সরলের একটা হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে বলে উঠেছিল, আমি এখনো দুই নৌকায় পা দিয়ে রেখেছি গো--
সরলের কথাটা একেবারেই ভালো লাগেনি। সে বলেছিল, তা চলেনা অরুণা, এক জনকে তুমি বেছে নাও--
সরল সত্যিই ভালবেসেছিল অরুণাকে। সে দিন রাতে সে বিছানায় শুয়ে চোখের জল ফেলে ছিল। ভালোবাসা ত্যাগে, নাকি ভোগে কিংবা ঈর্ষায় প্রকাশ পায় ? জানে না সরল।
সে দিন নদীপারে আনমনে এসে দাঁড়িয়েছিল সরল। হঠাৎ তার চোখে পড়ল, অরুণা ও পাড়ার একটা মেয়ে নদীর ঘাটে স্নান করছে। অনতিদূরে অরুণার প্রেমিক গোবিন্দ দাঁড়িয়েছিল। সে ওদের স্নানের দৃশ্য দেখছে ।
ভীষণ রাগ হচ্ছিল সরলের। এর মধ্যেই হঠাৎ চিৎকার শুনতে পেল সেl সে দেখল, অরুণা জলে ডুবে যাচ্ছে, সে চিৎকার করছে, সঙ্গের মেয়েটা ভালো সাঁতার জানে না হবে, চেষ্টা করেও অরুণাকে জল থেকে সে তুলে আনতে পারছে না। মেয়েটার মুখ থেকেও, বাঁচাও, বাঁচাও, অস্ফুট চিৎকার বেরিয়ে আসছিল। সরল দেখল গোবিন্দ ছুটে নদীর কিনারে গেল কিন্তু ও নদীতে ঝাঁপ দিল না।
সরল ভালো সাঁতার জানে, সে দেখল, ডুবন্ত অরুণার দুটো হাত ভেসে উঠল জলের ওপর। ব্যাস ওই পর্যন্ত--
সরলের মনে হল বহুদূর থেকে একটা আওয়াজ ভেসে আসছে--বাঁচার আবেদন-নিবেদনগুলি ভেসে উঠে, আবার ডুবে যাচ্ছে। সরল অন্যদিকে তাকিয়ে আকাশ দেখছিল, দেখছিল, একটা বড় গাছের মাথায় একটা পাখি জোরে জোরে ডানা ঝাপটাচ্ছিল।
সমাপ্ত

মনের অগোচরে কখন যে কী কাজ করে! অসাধারণ এক মনস্তত্ত্ব ফুটে উঠেছে লেখার মধ্য দিয়ে। লেখক কে ধন্যবাদ।
উত্তরমুছুন