সম্পাদকের কলমে--

সম্পাদকের কলমে--তাপসকিরণ রায়:

সম্পাদকীয়, পত্রিকার একটি অভিন্ন অঙ্গ। সাহিত্য জীবনের দর্শন। জীবনের সুখ দুঃখ সবকিছু উঠে আসে এখানে, স্মৃতির ঝাঁপি, প্রেম-বিরহ থেকে নিবেদন পর্যন্ত এখানে প্রতিফলিত হয়। এ সব দর্শন জীবনের ধারাবাহিকতাগুলিকে প্রচন্ডভাবে আলোড়িত করে। বর্তমান সময়ে যে ভয়াবহতার সৃষ্টি হয়েছে তার সবটুকুই করোনা মহামারীর দৌরাত্ম।

সবাই আজ আমরা আতঙ্কিত, বদ্ধ-বন্ধ বন্দীশালায় অনিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাসের মাঝখানে বসে আছি। উদ্বিগ্ন মন নিয়ে লেখা যায় না, যেখানে প্রতিদিন মৃত্যুর ছায়াগুলি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে চলেছে, সেখানে নিজেকে খুঁজে পেতেও যেন বড় কষ্ট হয়। তবু চলছে সবকিছু, সর্বহারা মানুষটিও সবকিছু ভুলে কখনো ম্লান হেসে ওঠে--হতে পারে তা নিজের অজান্তেই। আসলে মৃত্যু থেকে পালিয়ে বেড়ানই যে প্রাণীর ধর্ম। এই ধ্রুব সত্য মৃত্যুকে কেউ স্বেচ্ছায় বরণ করতে চায় না।

চোখের সামনে সবুজ ঘাস, বসন্তের শিমুল-পলাশ এ সব কিছু পসরার মাঝে আমরা সিঁদুরে মেঘ দেখে আতঙ্কিত হই। কখনো সমস্ত আলো নিভে গেলে অন্ধকারে আঁচড় কেটে আমরা লিখে যাই জীবনের কবিতা।

সমস্ত পথ একই জায়গায় গিয়ে মিশেছে। তবু হাতের কাছে কলম পেলে আমি আমার কথা লিখি, তোমার কথা লিখি, অভ্যাস মত উদ্ধৃত হয়ে যায় সুখ-দুঃখ বিরহের কবিতা। জানি বিয়োগ শেষ কথা নয়। আকাশে বাতাসে অন্তরীক্ষে সহস্র আলোড়নের মাঝে আত্মজনের অন্তর কথা, ব্যথার কথা, আনন্দ-বিরহ-বিয়োগেরকথা গীত হয়ে যায়।

সম্পাদকীয় প্রসঙ্গ লিখতে গিয়ে যেন আজ সব অবান্তর হয়ে পড়েছে। লিখতে লিখতে লেখকের কলম থেমে যাচ্ছে। আবার সে উঠে বসচ্ছে। এই সবই বুঝি প্রদোষকালের লেখা, তালসুরলয়হীন কথা, ছন্দপতনের অপভ্রংশ কথার জোড়াতালি…তবু আমরা লিখব, এই বিদায়ী রাত্রি শেষের হাহুতাশ, শব্দহীনভাষার সঙ্কেত, তবু ধরে নেবো অসুস্থ তাপিত জীবনের প্রলাপ। জনান্তিকে সঙ্গহীন কথা বলে যাব, উন্মাদ উন্মাদনায় খানিক বিহ্বল হেসে নেব, মাতালের মত না হয় অসংযত ব্যথার কথা নিয়ে খানিক কেঁদে নেবো।

কখনো মনে হয়, এই ঘরবেড়ের অন্ধকার ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে এসে দুহাত তুলে চিৎকার দিয়ে বলে উঠি, কোথায় আছো তুমি, হে জীবনদাত্রী, ভাগ্যনিয়ন্ত্রা, তুমি বাঁচাও...আমাদের তুমি বাঁচাও...

সহ সম্পাদক হিসেবে: শমিত কর্মকার--


আমরা আবার একটা কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। সবাই ভেবেছিলাম আমরা বোধহয় ঠিকঠাকভাবে চলছি। আবার সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে আগের মতো। আমরা শুরু করেছিলাম সাহিত্য সভা বই প্রকাশ খুব ভালো লাগছিল। যারা সাহিত্য জগতের সাথে যুক্ত তারা এইগুলো চায় লেখার সাথে সাথে। তাই আবার আবার আমাদের সকলকেই ঠিক থাকতে হবে। যতোটা সম্ভব এই এরিয়ে চলতে হবে। আশা রাখি আবার সব ঠিক হবে হবেই।


সহ-সম্পাদকের কলমে--সাবিত্রী দাস--

পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই মানুষ তার বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে অন্য প্রাণীদের থেকে নিজেকে আলাদা করতে সমর্থ হলেও গোড়ার দিকে প্রকৃতির শক্তি গুলোকে ভয় পেয়ে নতজানু হয়ে সেই শক্তি গুলোর কাছে অবনত হয়েছে বিনম্র প্রার্থনায়।

ক্রমে সময়ের বিবর্তনে মানুষ আবার এগুলিকে করায়ত্ত ও করতে চেয়েছে, আর সেই শক্তিগুলোকে কাজে লাগিয়ে মানুষ আজ মহা শক্তিধর।

প্রকৃতি কিন্তু কখনোই মেনে নিতে চায়না তার সৃষ্টির উপর অন্যের আধিপত্য কায়েম করার চেষ্টা।

রুষ্ট প্রকৃতি তাই ক্ষুব্ধ হয়ে বারেবারে চরম শোধ নিয়েছে,হেনেছে আঘাত! মানুষ তার কৃতকর্মের জন্যই হোক কিংবা অন্য কোনো কারণেই হোক সমগ্র মানবজাতি আজ ভয়ঙ্কর এক পরিস্থিতির সম্মুখে দণ্ডায়মান।

সুস্থ সুন্দর পৃথিবী আজ ভয়ঙ্কর এক অজানা অসুখে পীড়িত। এই পৃথিবী চায় এক অমল আশ্বাস।

মানুষের সঙ্গে মানুষের একটা দূরত্বের ব্যবধান উঠছে ঘনিয়ে। যদিও এই ব্যবধান হয়তো সাময়িক পরিস্থিতির কারণেই তবুও বুকের গভীরে কথাগুলো ছটফটিয়ে মরে, পারস্পরিক ভাব বিনিময় করে হতে চায় ভারমুক্ত। অধীর আগ্রহে ব্যাকুল হয়ে ওঠে প্রকাশের অপেক্ষায়। এরকমই কিছু সুখ দুঃখের সম্ভার নিয়ে সেজে উঠেছে আজকের বর্ণালোকের সংসার।


বৃহস্পতিবার, ৬ মে, ২০২১

শংকর ব্রহ্ম

 


 



গুরুদক্ষিণা

শংকর ব্রহ্ম

------------------------------

 

সেবার তিলজলায়,হতদরিদ্র ছেলেমেয়েদের এক প্রাথমিক স্কুলে পড়াতে গেছি।সেখানে পড়াশুনার চেয়ে স্কুলে এসে গুলতানি করাটাই ছেলেমেয়েদের মূখ্য কাজ।বাবা মা সকালে লোকের বাড়ি কাজে বেরিয়ে যায়।তা'রা ছেলেমেয়েদের এই ভেবে স্কুলে পাঠায় যে সারাদিন পথে পথে ঘুরে বেড়াবার চেয়ে স্কুলে গিয়ে খানিকটা নিরাপদে থাকবে,পড়াশুনা হোক বা না হোক।

      আমি একদিন টিফিনের পর ক্লাস নিতে গিয়ে শুনি,সকলেরই কিছু না কিছু চুরি গেছে ব্যাগ থেকে। কারও খাতা,কারও বই,কারও পেন্সিল, কারও রাবার, কারও বা টিফিনবাক্স থেকে খাবার।কে চুরি করতে পারে সকলেই জানে, কিন্তু হাতেনাতে কোনদিন তাকে ধরতে পারেনি কেউ।শুধু আজ নয়,প্রায়ই এ'ধরণের চুরি হয়।

ক্লাস শেষ হলে,আমি গোপনে ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে নামটা জেনে নিই। নামটা ধরুন তার সাবির খান।

পরদিন আমি তাকে ডেকে ক্লাসের মণিটার করে দিই।আর বলি, কেউ যদি ক্লাসে দুষ্টুমি করে, তাহলে তার নাম বোর্ডে লিখে রাখবি।আর বলি,এখন থেকে ক্লাসে কারও কোন জিনিষ চুরি না হয়,সে'সব দেখার দায়িত্বও তোর।কারও কিছু চুরি হলে আমি তোকে ধরবো।এই দায়িত্ব পেয়ে সে যেমন একদিকে গর্বিত হয়,অন্যদিকে পড়ে যায় ফাঁপরে।গর্বিত হওয়ার কারণ,এতোটা তাকে আর কেউ কোনদিন মূল্য দেয়নি, সবার উপরে সর্দারী করার। আর ফাঁপরে পড়ার কারণ,নাম লিখবে কি করে সে, তার যে একেবারে অক্ষর জ্ঞান নেই। ক অক্ষর গো- মাংস যাকে বলে প্রবাদে,সে একেবারে তাই।

আমি তাকে সাহস দিয়ে বলি,এ আর কি কঠিন কাজ। শিখে নিবি,তোর যা বুদ্ধি তা'তে শিখতে বেশী দিন লাগবে না।

সত্যি সত্যিই কিছুদিনের মধ্যে সে ক্লাসের চল্লিশ জনের নাম লেখা শিখে ফেলে।ধীরে ধীরে পড়াশুনায়ও তার উন্নতি দেখা যায়। তারচেয়েও বড় কথা ক্লাস থেকে চুরি বন্ধ হয়ে যায় চিরতরে।তারপর সে সাফল্যের সাথে ক্লাস ফোর পাশ করে, অন্য স্কুলে গিয়ে ভর্তি হয়।

এ'সব দশ বার বছর আগের কথা।

একদিন ধর্মতলা থেকে ৩৯ নম্বর বাসে করে তিলজলার স্কুলে ফিরছি,বাসের টিকিট কাটতে গিয়ে দেখি,পকেটের পঞ্চাশ টাকার নোটটি হাওয়া, পকেট মার হয়ে গেছে।বারবার পকেটে খুঁজি, আমার চারপাশে,পায়ের কাছে এদিক সেদিক খুঁজে না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ি।নিজেকে কেমন অসহায় লাগে।

ঠিক সে সময়ই একটি লম্বা চওড়া ছেলে,আমার দিকে এগিয়ে এসে বলে,স্যার কেমন আছেন? আমায় চিনতে পারছেন, আমি সাবির,আমার কথা আপনার মনে নেই?  

মনে পড়ে যায় তার কথা। বলি,হ্যাঁ পারছি,মনে আছে।কেমন আছ তুমি?

ভাল আছি স্যার, বলেই অতো লোকের মধ্যে বাসে ঢিপ করে আমাকে একটা প্রণাম করে,আমি তাকে তুলে ধরে বলি, এ কিরছ?

সে অমায়িক হেসে বলে,কি হয়েছে স্যার, আপনাকে এমন উৎভ্রান্ত দেখাচ্ছে কেন?

আমি তাকে বলি,পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার নোটটি গায়েব হয়ে যাওয়ার কথা।

সে বলে,তাই নাকি?

দেখুন তো স্যার আপনার পায়ের কাছে ওটা কি পড়ে আছে দেখুন তো?

আমি নীচু হয়ে ঝুঁকে দেখি,হ্যাঁ পঞ্চাশ টাকার নোটটিই পড়ে আছে।প্রাণে জল আসে।

আমি টাকাটি তুলে নিয়ে কন্ডাকটারের কাছ থেকে পাঁচ টাকার টিকিট কাটি।

আমি সাবিরকে খুশি হয়ে বলি,একদিন স্কুলে এসে দেখা করো।

সময় পেলে যা্ব স্যার।সারা মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ে তার,বলে আপনি ভাল থাকবেন স্যার।

আচ্ছা, বলে আমি বাস থেকে নেমে পড়ি তিলজলা স্টপেজে।

  স্কুলে এসে সবাইকে ঘটনাটা বলতেই, সকলে,বলে ওঠে,আপনি স্যার জানেন না?

- কি?

- ও তো এখন পকেটমারের লিডার হয়েছে?

- তাই নাকি? আমি আকাশ থেকে পড়ি।

তবে ও কি আমাকে গুরুদক্ষিণা দিয়ে গেল?


1 টি মন্তব্য:

  1. এই ব্লগে লেখকের নিয়মিত লেখা কবিতা ও গল্পগুলির বেশ ভালো লাগে। এ গল্পটিও বেশ লাগলো।

    উত্তরমুছুন