জয়
সাবিত্রী দাস
আমি আর আমার মা, এই দুজনকে নিয়েই সেসময় আবর্তিত হতো আমাদের ছোট্ট পৃথিবী টা। বাবাকে কর্মসূত্রে দিল্লি তে থাকতে হতো।ইচ্ছে থাকলেও বছরে দু তিনবারের বেশী তিনি আসতে পারতেন না।বাড়ীতে ঠাকুমা থাকলেও তিনি ঠাকুরের পূজাপাঠ ইত্যাদি নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। বিশেষ করে ঠাকুরদার আকস্মিক মৃত্যু তাকে সংসার সম্পর্কে নিস্পৃহ করে তুলেছিল। সেই নিস্পৃহতা দিন দিন বাড়ছিল বৈ কমছিল না। সংসারের ভালো মন্দ কোন কিছুতেই তার কোনরকম আগ্রহ ছিল না বললেই চলে।
আমি ছোট থেকেই বড়ো দুর্বল ছিলাম বলে নাকি জানি না গান শুনতে অসম্ভব ভালো বাসতাম। আমার বাবা নাকি সঙ্গীতানুরাগী ছিলেন। ঠাকুরদার অকাল প্রয়াণ তার অনুরাগের বিষয়টি হতে দূরে সরে যেতে বাধ্য করেছিল। অল্প বয়সেই সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হয়ে ছিলেন তিনি।
গানের প্রতি অনুরাগ টুকু বাবার কাছ হতে পাওয়া বললেই চলে। আগেই বলেছি মাকে ঘিরে আমার জীবন আবর্তিত হতো, মা সংক্রান্ত গান শুনতে আমার খুব ভালো লাগতো। বিশেষ করে " মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের বুকে ঝরে ।"গানটি আমার বড়োই প্রিয় ছিল। একটা ঘটনার কথা বলি।
সেদিনের কথা আমার আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। সেদিন "মধুর আমার মায়ের হাসি" কথাটির তাৎপর্য না বুঝলেও বুঝেছিলাম মা সেদিন দারুন আনন্দ পেয়ে ছিলেন।সেই আনন্দের দিনে মা কেঁদে ফেলেছিলেন আমাকে জড়িয়ে ধরে।মায়ের মুখে সেদিন এক অদ্ভুত এক হাসি দেখেছিলাম।সেই হাসির তাৎপর্য যদিও তখন বুঝতে পারি নি। বুঝেছি অনেক পরে,বড়ো হয়ে।
ছোটো থেকেই স্বাস্থ্য আমার যে খুব একটা খারাপ ছিল তা নয়।পর পর দুবার কঠিন অসুখে ভুগে শরীর আমার দুর্বল হয়ে পড়েছিল।কি কি অসুখ হয়েছিল তা এখন আর মনে পড়ে না।
দুর্বলতার কারণে আমাকে যেন সবসময় একটু আগলে আগলেই রাখা হতো।পড়াশোনা ভালোভাবে করলেও খেলাধূলা করার কথায় আমি ভাবতাম আমি ওসব পারবো না।দোতলার ব্যালকনিতে বসে বসে দেখতাম সব বাচ্চারা কেমন খেলছে।কখনো কখনো আমাকে শুকনো মুখে বসে থাকতে দেখে মা খুব দুঃখ পেতেন। কখনো কখনো মা আমাকে পার্কে নিয়ে যেতেন। আমি অন্য বাচ্চা দের খেলা দেখতে দেখতে মায়ের সঙ্গে গল্প করতাম। আমি কোনোদিন খেলতে পারবো কিনা জিজ্ঞাসা করে ফেললে মায়ের মুখখানি করুণ হয়ে উঠতো।এমনি করে দিনগুলো কাটছিলো।
আমাদের স্কুলে একজন নুতন মাস্টার মশায় এলেন ।খেলা ধুলার শিক্ষক তিনি।আমার কথাও শুনেছেন ।একদিন আমাকে বললেন মাকে কিছু বলতে চান।মা স্কুলে এলে তিনি আমার সম্পর্কে বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা করলেন। আমাকে কিভাবে ও কেমন খাবার দিতে হবে মাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দিলেন।আমাকে তিনি আলাদাভাবে একটু একটু করে খেলার মধ্যে ফিরিয়ে নিয়ে এলেন।আমিও মনের দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলতে আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম। মাষ্টার মশায়ের আন্তরিক প্রচেষ্টায়, সুশৃঙ্খল তত্ত্বাবধানে
ক্রীড়া প্রতিযোগিতার জন্য তৈরী হচ্ছিলাম।
তারপর এলো সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন।আমাদের সেদিন বাৎসরিক খেলাধুলা।তাড়াতাড়ি কাজ সেরে মা ও আমার সঙ্গে খেলার মাঠে গেলেন।
আমার নাম ছিল অংক -দৌড় এ।আমি দৌড় শুরু করলাম।আমার আগে তিনজন দৌড়ে এগিয়ে গেছে।তারপর মাঝে পেতে রাখা কাগজে অংক করলাম। সাধারন যোগের অংক!মাস্টার মশায় বলেছেন,তাড়াহুড়ো না করতে।তাই অংক করলাম মাথা স্থির রেখে।যদিও মনে আমার একটা উত্তেজনা তো ছিলই।অনেকদিন পর খেলায় অংশ নিতে পারার জন্য।অংকের কাজ সেরে আবার দৌড়!আমি তখন দু নম্বরে দৌড়াচ্ছি।দুনম্বরেই গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম।যাক দ্বিতীয় তো হয়েছি।
খেলার শেষে নাম ঘোষণা হলো, শুনলাম আমি প্ৰথম হয়েছি।যে প্রথমে পৌঁছেছিল তার অংক ভুল হয়েছিল।
পুরস্কার নিয়ে দেখি মা আমার দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে আছেন, মায়ের দুচোখে তখন জল।আমাকে বুকে জড়িয়ে আদর করলেন।মায়ের মুখে এক অদ্ভুত হাসি।সে হাসি জয় গৌরবের।

স্মৃতি থেকে নেওয়া একটি কাহিনী। এমনি হয়। জয়ের স্মৃতিগুলি কেউ ভুলতে পারে না। কাহিনী ও কলম দুটোরই প্রশংসা করতে হয়।
উত্তরমুছুন