কৌস্তুভ দে সরকার
মন থেকে বাড়ি যেতে চায়না অরুণাভ। খালি বলে, যাবো? যাবো কিনা? ওদিকে ফোনের লাইনে এত ডিস্টার্ব। কথাও শোনা যায়না। ভোট আসলে মনে হয় ওর এরকমই হয়। ওর ফোন ট্যাপ করে। কে বা কারা করে ও বোঝে না। কিন্তু এটা ওর সন্দেহ। সন্দেহের সঙ্গত কারণও আছে। প্রতিবারই ভোটের মাস খানেক আগে থেকে ওর ফোন কলে ডিস্টার্ব শুরু হয়। কেন হবে? যে সামান্য দু টাকার রিপোর্টার ও। তাও বাদ যায়না! যাইহোক। এতক্ষণ ফেসবুকের পোস্টেও ছয়লাপ হয়ে গেছে। এইমাত্র ভূমিকম্প হল। অমুক জায়গায় ভূমিকম্প অনুভূত।
অরুনাভর খুব রাগ হয় এই শালা বাঙালির উপর। এই একটি জাত। দেখছে সবাই পোস্ট দিচ্ছে। সেই একই বার্তা তাকেও জানাতে হবে। তাই সব শালা বৃহল্লাঙ্গুল লেঙ্গুর তুলে সেই একই পোস্ট দিতে থাকে। ও একটু ভিন্ন ধরণের। হুজুগে নাচে না। ভূমিকম্প হয়েছে তো হয়েছে। এতে এমন কি। মানুষ তাহলে এই একবিংশ শতাব্দীতেও বিজ্ঞানের এত অগ্রগতির যুগেও প্রাকৃতিক শক্তিকে ভয় পায়। যাক। মানুষের এইরকম ভয় পাওয়াই দরকার।
অরুনাভ মনে করে, মানুষ বড় বেপরোয়া বেয়াক্কেলে হয়ে গেছে আজ। কোনো কিছুই মানুষকে দমাতে পারছে না। সেখানে এই রকম কিছু হলে শালারা একটু যদি টাইট হয়। হোক। মাঝেমধ্যেই ভূমিকম্প হোক। তাহলে যদি শিক্ষা পায় মানুষ। আর শিক্ষা। এতবড় একটা মারী যাচ্ছে। মানুষের কি কিছু বাদ আছে? বিয়েবাড়ি, পিকনিক, কীর্তন, ভোট, পর্যটন, হোলি, ফাংশন, বাইক রাইড। কিছুই বাদ নেই।
নমিতার সাথে প্রায় পাঁচ ছয় বার ফোন চালাচালি হল। কিন্তু কেউ কারো কথা শুনতে পারছে না। অগত্যা নমিতাই ওকে ম্যাসেঞ্জারে কল করল। বলল, আসতে হবে না। থেমে গেছে। যাক গে। ল্যাটা চুকেছে। আর যেতে তো চাইছিলই না অরুনাভ। কারণ, ম্যাসেঞ্জারে ওর সাথে আগেই কথা হয়েছে সুতনুর, আজ সময় সুযোগ করে দেখা করবার। সুতনু, পাশের পাড়াতেই থাকে। অরুণাভর বিশ্বস্ত পরকীয়া। বিবাহ বা সংসার ভেঙে সংসার করার বা ঐজাতীয় কোনো শর্ত নেই ওদের ভালোবাসার। শুধু শর্ত একটাই, নির্ভেজাল ভালোবাসা, পরস্পরের জীবনের অভাব অভিযোগের নিরিখে নিজেদের মধ্যে একটা সহায়তায় সহমর্মিতাপূর্ণ ভালোবাসা। যেন দুজন দুজনের সংসার সামলে কিছুক্ষনের জন্য সেই গন্ডি থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে প্রাণখুলে একটু স্বস্তির শান্তির নিশ্বাস নেবে পরস্পরের কাছ থেকে। দূরের পাখিরা যেমন কোথাও এসে মিলিত হয়ে আবার ফিরে যায় আপন কুলায়, সে রকম। তাই সুতনু যখন বলেছে আজ যত রাতই হোক বাড়ির কাজ সামলে ও এসে অরুণাভর সাথে সিটি সেন্টারের পাশের গলিতে দেখা করবেই, কাজেই নমিতার ভূমিকম্পে ভয় পাওয়ার থেকে সুতনুর সাথে দেখা করাটা অনেক বেশি জরুরি আজ ওর কাছে। কিন্তু সুতনু কি সত্যিই আসতে পারবে ওর সাথে দেখা করতে? এই ভাবনাও ক্রমশঃ রাতের অন্ধকারের মতোই গ্রাস করছে ওকে। এই সময় রোজ ইভিনিং ওয়াকে আসে অরুনাভ। ইদানিং মোটা হয়ে যাওয়ায় ওর ফ্যাটি লিভারের সমস্যা কমানোর অন্যতম উপায় হিসেবে অন্ততঃ পাঁচ কিলোমিটার রোজ হাঁটার নিদান দিয়েছেন ডাক্তারবাবু। আর নমিতাও চায় এই সময়টা বাইরে একটু হেঁটে আসুক অরুনাভ। ছেলে মানুষ সারাদিন ঘরে থাকাটাও কেমন বেমানান বলে ও নিজেই ওকে ঠেলে বাইরে পাঠায়। আসলে এই সময়টা নমিতাও পরকীয়ায় মজে থাকে। নানারকম ফোন আসে ওর। কবেকার কোন দাদা, কোথাকার কোন বন্ধু, ভাই, বান্ধবী, বাপের বাড়ি, ফ্লিপকার্ট, কার কার যে ফোন আসে। ছুতা নাতা দিয়ে সেইসব ফোনে মশগুল থাকতে অনেকদিন দেখেছে অরুনাভ। ব্যাপারটা বুঝেও না বোঝার মতো কেমন এক বিকৃত মনের গা সওয়া ব্যাপার হয়ে গেছে ওর যেন আজকাল। আর, অরুণাভরও তাতে বেশ সুবিধাই হয়। এই সময়টা ওও ওর প্যায়ারের লোকের সাথে মন খুলে গল্প করতে পারে, আবার হাঁটাও হয়। আজ সুতনুর সাথে দেখা হওয়াটা খুব জরুরি। কারণ, অরুণাভর মনের ভেতরে আজ কেন যেন সুপ্রচুর হাহাকার, একাকীত্ব, হতাশা সব একসাথে বাসা বেঁধেছে। একদিকে করোনা, একদিকে ভোট, একদিকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, একদিকে বেকারত্ব, ধর্ম , অধর্ম, হিংসা, খুন, একটা অস্থির সময়ে বাড়িতেও নমিতার সাথে তার ঠিক বনিবনা হচ্ছে না। নমিতার সাথে একটা মানসিক দূরত্বের ব্যথার মলম হয়ে ওঠা সুতনু ওর এখন বেঁচে থাকার একটা অন্যতম অবলম্বনও। তাই এসময় সুতনুর মিষ্টি নরম হাতের ছোঁয়ায়, মুখোমুখি কিছুক্ষনের কথায় এবং ভালোবাসায় একটা মুক্তির বাতাস পাওয়া যেত। কিন্তু সুতনুর সাথেও আর যোগাযোগ হয়ে উঠছে না । কেন? কি হল আবার? কোনো সমস্যায় পড়লো নাকি সেও।
রাত ক্রমে বাড়তে থাকে, অরুনাভর হাঁটার গতি ক্রমে শ্লথ হয়ে পড়ে। তাহলে চিরকালের মতো আজকেও ধোঁকা দিল সুতনু? রোজই দেখা করবে বলে । কিছু একটা ছুতা দিয়ে আর আসে না। আজ না আসলে ও সিউর হয়ে যাবে যে ওকে খেলাচ্ছে সুতনু। আসলে সেও ওই গতানুগতিক। ভালোই বাসেনা ওকে। শুধু ম্যাসেঞ্জারে প্রেমের অভিনয় করে যায়। আজ ফাইনালি ডিসিশন নিয়েই নেবে অরুনাভ। ইসপার নয় উসপার। ভালো বাসবে না তাও ভালো কিন্তু কোনো নারীর ছলনায় আর ভুলবে না। শেষ পর্যন্ত হলোও তাই। দশটার দিকে ম্যাসেজ এল । স্যরি, কিছু মনে কোরো না, বাড়িতে লোক এসেছিল। আবার দেখা করার চেষ্টা করব কোনোদিন। রিপ্লাই দিল না অরুনাভ। শুধু ক্লান্ত বিষণ্ণ মনে ক্রমে ধীর পায়ে বাড়ির দিকেই পা বাড়ায় সে, আরেকটা নিরামিষ রাত কাটাবে বলে।

নতুন আঙ্গিকে লেখা একটি সুন্দর গল্প। ধন্যবাদ লেখককে।
উত্তরমুছুন