সন্ধ্যা রায়
সকাল থেকেই আজ আমাদের ঘরে ভিড় l আত্মীয়-স্বজন আসছে, চারিদিকে হৈ হৈ রৈ রৈ ব্যাপার। দুদিন পর আমার বিয়ে । আমার শ্বশুরবাড়ি খুব বড়লোক--গাড়ি বাড়ি শশুর মশাইয়ের নিজের পিওর সিল্ক এর কারখানা আছে। আবার বড় একটা ফার্মও আছে। ছেলে চাকরি বাকরি কিছু করে না। ওরা ব্যবসায়ী, আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার। এত বড় লোক আমার পছন্দ না, কিন্তু ওদের আমাকে খুব পছন্দ হওয়াতে বাবা মা রাজি। আমিও অগত্যা রাজি হয়ে গেলাম।
মহা ধুমধামে বিয়ে হয়ে গেল। আমার স্বামী সারাদিন কাজকর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকে। আমার সারাদিন শ্বশুর-শাশুড়ি ঝি চাকর নিয়ে ভালোই দিন কাটে। একদিন শ্রেয়ান মানে আমার স্বামী বলল, আজ আমি দিদিমার ঘরে যাব--আমাকে নিয়ে যাবার কথা কিন্তু সে বলল না। আমি ভাবলাম, আমিও যাব, কিন্তু সে কথা বলতে পারলাম না। দিদিমারা অনতিদূরেই থাকেন। রাতে আর সে দিন শ্রেয়ান ফিরল না। দামিনী, কাজের মেয়েটা এসে বলল, কাল রাতে দাদাবাবু এলো না--তাই না ? এমনিতেই আমি ভীষণ রেগে ছিলাম, ওর কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলাম, বললাম, এই, এত বেশি কথা বলতে হবে না, তুই নিজের কাজ করে বেরহ ত এখান থেকে। দামিনী ঝাড়ু দিতে দিতে গজ গজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমি চুপ করে শুয়ে রইলাম ।
আজ আর উঠে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না । একটু পরেই শাশুড়ি মা এসে বললেন, বৌমা তোমার শরীর ভালো তো ? উঠে পড়, শরীর খারাপ হবে, বেশিক্ষণ না খেয়ে থেকো না, বলে তিনি চলে গেলেন। আমিও উঠে পড়লাম। শ্রেয়ান বিকেলে এলো। আমি মুখ ভার করে থাকলাম কিন্তু শ্রেয়ান ঘোষের প্রাঞ্জল ব্যবহারে কখন যেন আমি সব কিছু ভুলে গেলাম। আবার স্বাভাবিক দিন চারিয়াতে ফিরে এলাম। হাসিখুশিতে দিন কাটছিল। এবার আমাদের ঘরের সবাই দিদাকে দেখতে যাবে বলল। আমার শাশুড়ি মা তার বনেদিয়ানা দেখাতে চান, তাই আমাকেও তিনি নিয়ে যাওয়ার কথা বললেন । আমিও গেলাম মামাশ্বশুরের বাড়ি । কাজ সেরে শ্রেয়ান আর শ্বশুর মশাই মামাশ্বশুরের বাড়িতেই পৌঁছালেন। ওখানে গিয়ে দেখলাম মামীর কোন সন্তান নেই। মামা নেভিতে চাকরি করেন । ছ'মাসে একবার বাড়িতে আসেন। সত্যি বাড়িখানা বনেদি বাড়িই বটে ! বিশাল গৌরবে সেটা দাঁড়িয়ে আছে। ঝি চাকর খানসামা কাজ করে যাচ্ছে। লোক মাত্র দু'জন, মামি আর দিদা। দিদা দুপুরে মামির সাহায্য নিয়ে খাওয়া দাওয়ার বিরাট আয়োজন করেছেন। আবার রাতের খাওয়া খেয়ে আমরা বাড়ি ফিরব কথা হল। কিন্তু রাতে খাওয়ার পর শ্রেয়ান বলল, দিদা আজ আমি তোমার কাছে থাকবো।
দিদা কিন্তু নারাজ, তিনি পরিষ্কার বললেন, বৌদি মনি এসেছে, তুই বৌদি মণিকে নিয়ে ঘরে ফিরে যা, আবার আসবি--
স্বামী নাছোড়বান্দা ছিল, আমি থাকবো, বাবার গাড়িতে ওরা ফিরে যাবে--
আমি বললাম, সেটা চিন্তা করো না, আমিও থাকব--
দিদা বললেন, হ্যাঁ, তবে দুজনেই থাক--
আমরা দুজনেই রাতে থেকে গেলাম । রাতে খাওয়ার পর শ্রেয়ান আমায় বাড়িটা ঘুরে দেখালো।
মাঝ রাতে আমার ঘুম ভেঙে গেল । দেখলাম স্বামী বিছানায় নেই। ভাবলাম বাথরুমে গেছে হবে। এলো না--অনেকক্ষণ সময় হল । আমার ঘুম আসছে না । পাশের ঘর থেকে ধীরে কথার আওয়াজ আসছে। দরজাটা ওপাশ থেকে বন্ধ। আমি আস্তে হাত রাখতেই বন্ধ দরজা একটু ফাঁক হল, দেখলাম, মামি আর আমার স্বামীর শুয়ে আছে । আমি দেখে হতবাক রইলাম, সরে এলাম দরজার কাছ থেকে । ঘড়িটা ঢং ঢং করে চারটে বাজার ঘোষণা করল ।
আমি বিছানায় এসে বসে পড়লাম। অনেকক্ষণ স্থবিরের মত বসে থাকলাম। কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি। একটু পরে সম্বিত ফিরে পেলাম । একটা শল গায়ে চড়িয়ে পার্সটা হাতে নিয়ে আমি হনহন করে হেঁটে চললাম। তখন আমার কোন হুশ নেই…. হাঁটছি হাঁটছি পাশ দিয়ে গাড়ি-ঘোড়া চলাচল করছে । আমি একটা বাসস্টপের কাছে এলাম । একটা বাস এলো, কন্ডাক্টারের, শিলং শিলং, আওয়াজ পেয়ে আমিও শিলংয়ের একটা টিকিট কেটে বাসে উঠে বসলাম । কত সময় বসে আছি জানি না । যত এগোচ্ছি পাহাড় বনের দিকে দূরে তাকিয়ে আছি। তখনও আমি রাগে অস্থির। এক জাগায় বাস থামল । সেখানে নেমে কিছু কিনলাম, খেলাম । আবার বাসটা চলতে শুরু করল । দুপুর গড়িয়ে গেছে। এসে পৌছালাম শিলং । বাস থেকে নেমে পৌঁছে গেলাম বান্ধবীর বাড়ি । ওকে সব কিছু খুলে বললাম। থেকে গেলাম ওখানে।
শুরু করলাম নতুন জীবন । আবার ভোর হবে, নতুন সূর্য উঠবে।
সমাপ্ত

কখনও জীবন বড় রহস্যময়। উত্থানপতনের মধ্যদিয়ে কখনও চমক নিয়ে আসে। কখনো সংসারের সাজানো ভীত আচমকা উৎপাটিত হয়ে যায় কেউ তা বলতে পারে না। এমনি এক আচমকা ঘর ভাঙার গল্প বিষাদ ছড়িয়ে যায় মনে। আকর্ষণীয় এক গল্প।
উত্তরমুছুন