প্রেসার
জেবুননেসা হেলেন
খুব গরম পড়েছে।ঘাম শরীর চুইয়ে বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে।এপাশ ওপাশ করে রীতা উঠে বসলো।ঘুম আসছে না আজও।কি এক শূন্যতায় ছাওয়া চারপাশ।ঘাড়ে হাত দিয়ে দেখে ভিজে ঘাম নুনজল গড়িয়ে পড়ছে পিঠ বেয়ে শিরদাঁড়া বরাবর।বিরক্তিকর শিরশির একটা অনূভুতি ঝাঁকুনি দিয়ে মনে করিয়ে দিলো সেই স্বাভাবিক সময়ের দিনটির কথা।
নদীর ধারে সে আর নোমান বসে লঞ্চঘাটের দৃশ্য দেখছিলো।একটা যায় নোঙর তুলে,একটা আসে নোঙর ফেলে।
ভেঁপু বাজে...
ওরা বেড়াতে এসেছে।বসে বসেই নদীর মিষ্টি হাওয়ায় সন্ধ্যা রাতের গভীরে ঢুকে গেলো। কত বছর পর সব পেছনে ফেলে ওরা বেড়াতে এসেছে! মনে করতে পারে না।
কেমন যেনো মাটির একটা সোঁদা গন্ধ মাতাল করে রাখে বসে থাকা মাটিতেই।কেউ কিছু বলছিলো না তেমন।দু'জনই দৃশ্যাবলীতে বিলীন।যেন সদ্য কুমার কুমারী।
বয়সের কথা ভুলে বসে ছিলো ওরা একে অন্যের গা ঘেঁষে।
এদিকে লোকজনের চলাচল কম।সাধারণত এমন নিবিড় হবার মত জায়গা চোখে পড়ে না কোথাও।পেছনে ফুলহীন কাশের ঘাস।সামনে দূরে লঞ্চঘাট আর নদীর বয়ে যাওয়া স্রোত।
একটু যেন ঠাণ্ডা লাগছে। আঁচলটা টানতে গিয়ে রীতার মনে হলো শীরদাঁড়া বেয়ে কিছু একটা উঠে আসছে ব্লাউজের ভেতরে।শিরশিরে বিরক্তিকর আর আতংকিত একটা অনুভূতি। নোমানের হাত চেপে ধরে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়িয়ে সে বলে উঠলো," উফ! কি যেন পিঠে ঢুকে গেছে!সাপ নয়তো?"
এক মূহুর্ত দেরী না করে নোমান হাত ঢুকিয়ে দিলো ব্লাউজ গলিয়ে পিঠের মধ্যে।
একটা বেশ বড় গোবরে পোকা মুঠ করে ধরে সামনে খুলে হেসে উঠে বললো,"যাহ! সামান্য পোকা।ভীতু কোথাকার সাপ আসবে কোথা থেকে?" হো হো হা হা করে হেসে হাঁটতে থাকলো ওর কোমর জড়িয়ে।
লোকালয়ে এসে কোমর ছেড়ে হাত ধরলো।
টং দোকানে বসে অনেক লোকের মধ্যে চা খেলো।এরপর মোবাইল অন করে বাসার খবর নিলো। বেশ রাতে বাসায় ফিরলো দু'জন।
বড় মেয়ে ঘুমিয়ে গেছে।ছোট মেয়ের এইচ এস সি পরীক্ষা সামনে, হয়ত পড়ছিলো।দরজা খুলে দিলো।মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো," মা! তোমাকে কিশোরী কিশোরী লাগছে। তাই না বাবা?" নোমান হেসে আড়চোখে রীতার দিকে তাকিয়ে বললো," তাই তো!”
তিন মাস সবাই কোয়ারেন্টাইনে আছে।কিন্তু নোমান ছুটি পায় নি।ডাক্তারদের ছুটি নেই।করোনা গোটা বিশ্বকে বদলে দিচ্ছে। রীতা নোমান দু' জনই পরোপকারী। রীতা একদিনও নোমানকে তার দায়িত্ব পালনে বাঁধা দেয় নি।
রীতা উঠে লাইট জ্বালিয়ে ডিপফ্রিজের ওপর থেকে টিস্যু নিলো।ঘাড়গলা মুছে,বেসিনের কল থেকে চোখে মুখে পানি দিলো।
ডাইনিংয়ে এসে টেবিল থেকে দুই গ্লাস পানি খেলো।নিজেই বুঝতে পারলো,প্রেসারটা হাই।কিন্তু ইচ্ছে করছে না মেশিনটা বের করে প্রেসার মাপতে বা মেয়েদের ডাকতে।কোনো ওষুধ পথ্যও মুখে দিতে ইচ্ছে করছে না।
ড্রয়িং রুমে ঢুকে লাইট জ্বালালো।এসি ছাড়লো।ক্লান্ত শরীরটা সোফায় এলিয়ে দিতেই দেয়ালে পারিবারিক ছবিটায় চোখ পড়লো।বুকের অতল তল থেকে দীর্ঘ এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। শরীর ঘেমে উঠছে আরো। আজ পাঁচদিন নোমান কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে ওদের ছেড়ে চলে গেছে।রাত গভীর হচ্ছে,
রীতার ঘাম বেড়েই চলেছে…

পড়লাম, ভালো লাগলো গল্পটি।
উত্তরমুছুন