
গোধূলিয়ার পথে
জয়িতা ভট্টাচার্য
তৃণাঞ্জনের ঘুম ভেঙে যায় মধুর মূর্চ্ছনায়। ভোরের মঙ্গলাচারণ শুরু হলো। অন্যদিকে মসজিদে আজানের ধ্বনি। হালকা শীত।চাদরটা গায়ে জড়িয়ে ব্যালকনিতে এলেই কুয়াশার কাঁচ ভেদ করে চোখে পড়ে প্রবাহিত গঙ্গা। উস্তাদ বিসমিল্লা খাঁর গঙ্গা,ত্রৈলঙ্গস্বামীর গঙ্গা, বাবার প্রিয় গঙ্গা,তার.. তৃণাঞ্জনের গঙ্গা ...
বারবার এই প্রাচীন শহর হাতছানি দেয়।
হালকা সাদা উঁকি দিচ্ছে চুলে চল্লিশ পার তৃণাঞ্জনের।
এবার আসা ভিন্ন কারনে।
বাবার কাজ করতে এখানে আসা বাবার ইচ্ছে মেনে।
বাবা খুব রাশভারি ছিলেন।আবেগ নেই।নিরাসক্ত যেন লৌহমানব।কিন্তু শেষ দিকে গভীর এক অবসাদে ভুগতেন।
আসতে চাইতেন বেনারসে বারবার।শয্যাশায়ী বাবা নির্নিমেষ জানলার বাইরে খাড়া নিমগাছটা দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কী যেন মনে করার চেষ্টা করতেন।
নীরবে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ত।
মাকে তার মনে পড়ে না।
গ্রামের মেয়ে লেখাপড়াও তেমন জানতেন না।সবই শোনা কথা বাবার মুখে।বাবা সেই সব গ্রাম আর মানুষ পরিত্যাগ করে শহরে চলে আসেন।
ব্যস্ত বাবা দিল্লি মুম্বাই লণ্ডন ...তার সঙ্গী কাদু পিসী। ঠাকুমা,হোস্টেল,বন্ধু, বাবার কন্ঠ আর ...গঙ্গার নানা পাড় উজানে উজানে।
তৃণাঞ্জনের জীবন সাদামাটা বড়োসড়ো ডিগ্রিসহ।পড়াশোনা করতে হবে আর পৌঁছাতে হবে সর্বোচ্চ শিখরে। মনের ভেতর খড়পোরা তোতাপাখি।তার মধ্যেই ভাগীরথীর জোয়ার ভাঁটার মত বনানী তার জীবনে।এসেছে চলেও গেছে।
বনানী অবশ্য ভালো আছে তার পুত্র কে নিয়ে।এই সচেতন বিচ্ছেদে। তৃণাঞ্জনের সামনে শুধুই জল আর ঢেউ এখন।
ভিড় হচ্ছে মানুষের। ধর্মভীরু মানুষ।
কী দেবে গঙ্গা? শান্তি? তবুও শান্তি... নদী হাতছানি দেয়।
আহ্বান করে বাবার কাজ।মন কেমন করে তার। ছেলেমানুষ যেন। দীপ ভাসিয়ে দেয় প্রতিবার।কার জন্য তা জানে না তৃণাঞ্জন।
কেন আসে জানে না সে এখানে এই গঙ্গার পাড়।
গোধূলিয়া মোড় রূপ পাল্টে ফেলে। মানুষের ধর্মবুদ্ধির পরিসর ছোটো হতে দেখে। তার মাথায় টার্গেট, তার মাথায় সাফল্য কর্পোরেটের।
মা। একটা অস্পষ্ট অনুভূতি র নাম।শুধু এখানে এলেই... সন্ধারতির মতো স্মৃতি ভেসে ভেসে যায় কত কত দীপ জ্বল জ্বল করে ভেসে যায় দিগন্তের দিকে।
আজ, গোধূলিয়া মজেছে রঙে রঙে। অনেক আলো। দেওয়ালি আসছে। বনানীর সঙ্গে সম্বন্ধ বাবা করেছিলেন। প্রেম নিয়ে সে কখনো ভাবার সময় পায়নি।বাবাই সব। একের পর এক পাশ আর একের পর এক প্রমোশন। এর মধ্যে বনানীর সত্যি কোথাও কি জায়গা ছিল? এখন মনে হয় বোধহয় কেউ থাকলে ভালো হতো,পাশে।
দূরে মনিকর্নিকা। আগুন জ্বলছে। বিকেল পড়ে আসছে।
লাল লাল আকাশ। আরতি বিশ্বনাথ মন্দিরে, সরু গলি,প্যারার দোকান ,রং বেরঙের চুড়ি। ভিড়।
সামনে শিরা ওঠা হাত। নরুণ পাড় শাড়ি। কোঁচকানো চামড়া অসহায় দুটি চোখ।
তৃণাঞ্জন ফেরায় না তাকে। রোজ আসেন এই বিকেলে।
ঘর বাড়ি নেই হয়ত। পথের পাশেই বসে থাকেন।
বাবার কথা মনে হয়।
বাবা তার আইকন।সিংহরাশি। তৃণাঞ্জনের মধ্যে একটা হেরে যাওয়া ব্যাপার আছে। গ্ল্যামারহীন। বাবা ছিলেন ইম্প্রেসিভ।স্মার্ট।
এত সিঁদুর জলে আজ।এত অস্তগামী আলো...সামনে শিরা ওঠা হাত।
আজ পাশে বসে দেখছে বৃদ্ধা তাকেই। অস্বস্তি হয় তৃণাঞ্জনের।
"তোমার বুকে লাল তিল, বাছা"
ওহ, হ্যাঁ মা __ তৃণাঞ্জনের অস্বস্তি হয়।
তোমার পিঠে জরুল আর পেটে কি এমন লাল টুকটুকে একটা আঁচিল আছে?"
তৃণাঞ্জনের অস্বস্তি ছাড়িয়ে বিস্ময় বিস্তৃত হয় চোখে মুখে।
হঠাৎ মৃদঙ্গের ধ্বনি দ্রুত। আরতি শেষ হবে।
-" বলো না বাবা " আকুতির জবাবে কোনওক্রমে ঘাড় হেলায় তৃণাঞ্জন।
লালচে আলো বেয়ে চোখের জল নামছে তাঁর গাল বেয়ে। কাঁপা হাতে ছেঁড়া কাপড়ের ঝোলা থেকে দুটি হলদেটে ছবি ।চমকে ওঠে তৃণাঞ্জন।
ঋতু বদলে গেছে।গঙ্গা মায়ের আরতির জোগাড় আর পুজোর ঘাটে একসময় বসে থাকা এক ভিখারিনি সবিতার জীবনে আরো কিছু বাকি ছিল তা গোধূলিয়ার পথ জানত। জানত হয়ত দেবতার চোখ।
তাই একদিন আশ্চর্য চলচ্চিত্রের মত এক ছেলে খুঁজে পায় তার হারিয়ে ফেলা মা কে।
সেদিন গঙ্গায় অনেক ঢেউ,আকাশে নক্ষত্র জ্বল জ্বল করে।
সেদিন আরো জীবন্ত হয়ে ওঠে পাথরের দেব।
জীবন নাটকের চেয়ে কখনও আরো নাটকীয়। কখনো জীবন শেষে এসে ফুল ফুটিয়ে যায় নীরবে।
সবিতা আঁকড়ে ধরে তৃণাঞ্জনের বুক।পলকা শরীর অসহায় এক নারী।
আরো প্রবাহ। আবহমান চলতেই থাকে সময়।
আট বছর পরের একটি দিন।গঙ্গা প্রবাহিনী আজও সেদিনের মত। তৃণাঞ্জনের পাতলা চুলে শুভ্রতা। আরো একটু বদলে গেছে দিন বদলে গেছে চশমার লেন্স।বারবার ঝাপসা হয়ে আসে দৃষ্টি। বারবার চোখ মুছে আবার মন্ত্র পড়ে সে।মা ।তার মা চলে গেছেন তারা হয়ে।
ঘাটে সাজানো দান সামগ্রী, পিণ্ডদান ,পাখি মুক্তি পায়।
মনের শান্তি।তৃণাঞ্জনের বুকে মোচড় দেয় কান্না।
আরো কত মা ,প্রতারিত মা , বিতারিত মা এই গরিব দেশে আজও ভিখারিনি প্রতিটা মন্দিরে মসজিদের অপর পাড়ে বসে আছেন।
তার দুঃখিনী মার মত।
কালো রং, উচ্চ শিক্ষা আর সফিস্টিকেসনবিহীন মা... যাকে বাবা ঝোঁকের বসে বিয়ে করেছিলেন আর তারপর ফেলেও দিয়েছেন ।
এমনকি সন্তানকেও কেড়ে নিয়ে ফেলে চলে গেছেন একদিন বিপাকে।
মা কে উদ্ধার করে সব সুখটুকু উজাড় করে দিতে দিতে পলকে এই আট বছর....।
এই আট বছরে মা কে নিয়ে কত তীর্থে, কত আনন্দে,দামি শুশ্রুষা আর ভালোবাসায় কেটে গেছে স্বপ্নের মত।
মা র কাছে শুয়ে তৃণাঞ্জনের চোখ বারবার তাকিয়ে থেকেছে বাবার ছবির দিকে।
নতুন চোখে আবিষ্কার, নতুন করে এক ইস্পাত কঠিন আদ্যন্ত অভিনেতা বাবাকে আবিষ্কার। মা কখনো নালিশ করেননি তবু।শুধুই বালিকার মত তৃণাঞ্জনকে আঁকড়ে ধরে নীরব মা।
এখন সব চাওয়া পাওয়ার উর্দ্ধে মা। হাওয়া দিচ্ছে।
ঢেউ...
একটা দীপ টলমল করে চলে যাচ্ছে দূরে। তার থেকে অনেক অনেক দূরে।
তৃণাঞ্জনের কান্না পাচ্ছে খুব।
অভিজ্ঞ লেখিকার সুন্দর গল্প
উত্তরমুছুন